বিশেষ প্রতিবেদন : ঢাকার মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগমের মরদেহ কয়েকদিন পর উদ্ধার হওয়ার ঘটনা শুধু একটি মৃত্যুসংবাদ নয়; এটি আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সামনে এক নির্মম বাস্তবতা উন্মোচন করেছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন মা কীভাবে নিঃসঙ্গতা, অবহেলা ও অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটান—এই ঘটনা সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
বলা হচ্ছে, নুরজাহান বেগমের সন্তানরা সবাই উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। কেউ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ বিদেশে বসবাস করেন। কিন্তু বাহ্যিক সাফল্যের এই গল্পের আড়ালে একজন মায়ের নিঃসঙ্গ জীবনের করুণ পরিণতি জাতিকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।
উন্নয়নের আড়ালে মানবিক সংকট
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে বাড়ছে পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব এবং প্রবীণদের অনিরাপদ জীবন। একসময়ের যৌথ পরিবার ভেঙে গিয়ে এখন অনেক প্রবীণ মানুষ সন্তান-সন্ততি থাকা সত্ত্বেও একা বসবাস করছেন।
অনেক ক্ষেত্রে তাদের নিয়মিত খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই। অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়, আর মৃত্যুর পরও দিনের পর দিন খবর না পাওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটছে। মিরপুরের এই ঘটনা তারই এক বেদনাদায়ক উদাহরণ।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়?
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো প্রবীণ নাগরিকদের জন্য শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবীণদের জন্য রয়েছে পেনশন, হোম কেয়ার, নার্সিং সেবা, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার নানা কর্মসূচি।
মুসলিম বিশ্বের সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও তুরস্কেও প্রবীণদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও বিশেষ সেবার ব্যবস্থা রয়েছে।
বাংলাদেশেও বয়স্ক ভাতা ও কিছু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি রয়েছে। তবে ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা বিবেচনায় তা এখনও যথেষ্ট নয়। এখন সময় এসেছে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা, জেরিয়াট্রিক চিকিৎসা, সিনিয়র কেয়ার সেন্টার এবং জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার।
ইসলামের আলোকে পিতা-মাতার মর্যাদা
ইসলাম পিতা-মাতার সেবাকে শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং মহান ইবাদত হিসেবে ঘোষণা করেছে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন,
“তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে।”
— (সূরা আল-ইসরা: ২৩)
আরও বলেন,
“হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।”
— (সূরা আল-ইসরা: ২৪)
রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন,
“ধ্বংস হোক সেই ব্যক্তি, যে তার পিতা-মাতাকে বার্ধক্যে পেয়েও জান্নাত অর্জন করতে পারল না।”
— (সহিহ মুসলিম)
আজকের সমাজে যখন বৃদ্ধ মা-বাবা নিঃসঙ্গতার শিকার হচ্ছেন, তখন এসব নির্দেশনা শুধু ধর্মীয় বাণী নয়; বরং মানবিক সভ্যতার ভিত্তি।
পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব
প্রবীণদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হলে পরিবারকে প্রথম দায়িত্ব পালন করতে হবে। সন্তানদের মনে ছোটবেলা থেকেই পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও সেবার শিক্ষা জাগ্রত করতে হবে।
একই সঙ্গে সমাজকেও আরও মানবিক হতে হবে। প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, মসজিদভিত্তিক সামাজিক উদ্যোগ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো প্রবীণদের খোঁজখবর নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে।
রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আধুনিক প্রবীণ সেবা কেন্দ্র, স্বাস্থ্যবিমা, জরুরি সেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা কর্মসূচি চালু করা সময়ের দাবি।
শেষ কথা
মিরপুরের নুরজাহান বেগমের মৃত্যু আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছে—জীবনের শেষ অধ্যায়ে মা-বাবার আশ্রয় কোথায়?
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু উঁচু ভবন, উন্নত অর্থনীতি বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে নয়; বরং সে তার প্রবীণ নাগরিকদের কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা দিতে পারে, তার মধ্যেই নিহিত।
আজ আমাদের প্রত্যেকের বিবেকের কাছে প্রশ্ন—
মা-বাবার শেষ আশ্রয় কি নিঃসঙ্গ একটি ফ্ল্যাট, নাকি সন্তানের ভালোবাসা, সমাজের সহমর্মিতা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল সুরক্ষা?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আমাদের মানবিকতা, আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধ এবং আমাদের ভবিষ্যৎ সমাজের চরিত্র।