মোঃ সবুর শেখ, সাংবাদিক ও লেখক : বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে যে ক’জন মহামানব যুগের সীমানা অতিক্রম করে আজও মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম অন্যতম। তিনি ছিলেন কেবল একজন কবি নন; তিনি ছিলেন বিদ্রোহের প্রতীক, মানবতার কণ্ঠস্বর, সাম্যের দূত এবং প্রেম ও ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর কলমে যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রনিনাদ উচ্চারিত হয়েছে, তেমনি মানুষের প্রতি ভালোবাসা, শান্তি ও সৌন্দর্যের গানও ধ্বনিত হয়েছে গভীর মমতায়।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে, পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে। তাঁর পিতা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন মসজিদের ইমাম ও খাদেম এবং মা জাহেদা খাতুন ছিলেন স্নেহময়ী গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই নজরুলের জীবন ছিল দারিদ্র্য ও সংগ্রামে ভরা। কিন্তু এই সংগ্রামই তাঁকে গড়ে তোলে অদম্য সাহসী এক মানুষ হিসেবে।
শৈশবে তিনি মক্তবে পড়াশোনা করেন এবং অল্প বয়সেই ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। পিতার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ে তাঁর ওপর। জীবিকার তাগিদে কখনো মসজিদে মুয়াজ্জিন, কখনো রুটির দোকানের কর্মচারী, আবার কখনো লেটো গানের দলে কাজ করেছেন। এই বৈচিত্র্যময় জীবনের অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যকে করেছে আরও প্রাণবন্ত ও গভীর।
নজরুল ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ—সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় অসামান্য অবদান রেখেছেন। তাঁর লেখা “বিদ্রোহী” কবিতা বাংলা সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা করে। এই কবিতায় তিনি অন্যায়, শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষের মুক্তির ডাক দিয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে—
“বল বীর—
আমি চির উন্নত শির!”
এই উচ্চারণ কেবল কবিতার পঙক্তি নয়; এটি ছিল পরাধীন মানুষের আত্মমর্যাদার জাগরণ।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নজরুল সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ধূমকেতু ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। এজন্য তাঁকে কারাবরণও করতে হয়। কারাগারে থেকেও তিনি মাথা নত করেননি। বরং লিখেছেন “রাজবন্দীর জবানবন্দী”—যেখানে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও সত্যের প্রতি তাঁর অবিচল অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও নজরুল ছিলেন অসাধারণ উদারচেতা। তিনি ইসলাম ধর্মের চেতনায় যেমন অনুপ্রাণিত ছিলেন, তেমনি হিন্দু ধর্মের সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিকতাকেও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। তাঁর রচিত ইসলামী গান যেমন মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে, তেমনি শ্যামাসঙ্গীত ও ভক্তিগীতিও সমান জনপ্রিয় হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন—ধর্ম মানুষের মধ্যে বিভেদ নয়, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির সেতুবন্ধন তৈরি করবে।
নজরুলের রচনায় মানবতার জয়গান বারবার ধ্বনিত হয়েছে। তিনি সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতা “সাম্যবাদী”-তে তিনি লিখেছেন—
“গাহি সাম্যের গান—
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান।”
এই সাম্যের বাণী আজও পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের জন্য প্রেরণার উৎস।
সংগীত জগতেও কাজী নজরুল ইসলামের অবদান অনন্য। তিনি প্রায় চার হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছেন, যা “নজরুল সংগীত” নামে পরিচিত। প্রেম, বিরহ, দেশপ্রেম, আধ্যাত্মিকতা ও বিপ্লব—সব অনুভূতির অপূর্ব প্রকাশ ঘটেছে তাঁর গানে। তাঁর সৃষ্টিগুলো আজও বাঙালির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
জীবনের শেষভাগে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে তিনি দীর্ঘদিন নির্বাক জীবন কাটান। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসে এবং জাতীয় কবির মর্যাদায় ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়।
আজ তাঁর জন্মজয়ন্তীতে আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি সেই মহান কবিকে, যিনি কলম দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, গান দিয়ে মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা জাগিয়েছেন এবং ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার কথা বলেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বাংলা সাহিত্যের কবি নন; তিনি বাঙালির চেতনার চিরন্তন দীপশিখা।
তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল থাকতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে এবং মানুষকে ভালোবাসতে। বিদ্রোহ, প্রেম, সাম্য ও মানবতার এই মহান কবি যুগে যুগে বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন।