মেঘলা আকাশ, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও মুসল্লিদের ঢল; জাতীয় ঈদগাহে প্রধান জামাত ঘিরে তৈরি হলো ঐক্য, শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় উপস্থিতির এক প্রতীকী আবহ
নিজস্ব প্রতিবেদক : পবিত্র ঈদুল ফিতরের সকালে রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দান শুধু একটি ধর্মীয় সমাবেশের স্থানই ছিল না, বরং এটি পরিণত হয় রাষ্ট্রীয় ঐক্য, রাজনৈতিক সহাবস্থান এবং জনমানুষের ধর্মীয় আবেগের এক বিরল প্রতীকে। শনিবার (২১ মার্চ) সকাল সাড়ে ৮টায় অনুষ্ঠিত দেশের প্রধান ঈদ জামাতে একসঙ্গে নামাজ আদায় করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্যমতে, তাঁরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন এবং এটি তিন দশকেরও বেশি সময় পর জাতীয় ঈদগাহে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর একসঙ্গে ঈদের নামাজে অংশ নেওয়ার ঘটনা।
এ দৃশ্যকে নিছক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভাজন, অবিশ্বাস ও মুখোমুখি অবস্থানের যে দীর্ঘ বাস্তবতা, সেখানে জাতীয় ঈদগাহে রাষ্ট্রের দুই শীর্ষ ব্যক্তির একই কাতারে উপস্থিতি জনমনে একটি নরম কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেয়—রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি আনুগত্য এবং অন্তত প্রতীকী স্তরে জাতীয় সংহতির প্রয়োজনীয়তা এখনও অক্ষুণ্ন। এই উপস্থিতি ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় শালীনতা ও জনসম্পৃক্ততার একটি সচেতন প্রকাশ বলেই প্রতীয়মান হয়। এ জামাতে মন্ত্রিসভার সদস্য, বিচারপতি, কূটনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও অংশ নেন।
জাতীয় ঈদগাহ ঘিরে সকাল থেকেই ছিল উৎসবমুখর কিন্তু নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ। ভোর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসল্লিরা মাঠে আসতে শুরু করেন। সকাল ৭টার দিক থেকেই দীর্ঘ সারি তৈরি হয় প্রবেশমুখে। আর্চওয়ে, মেটাল ডিটেক্টর ও একাধিক ধাপের তল্লাশি পেরিয়ে মুসল্লিদের ঈদগাহে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। পুরো এলাকা সিসিটিভির আওতায় রাখা হয় এবং র্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তীক্ষ্ণ নজরদারিতে দায়িত্ব পালন করেন।
মেঘলা আকাশ আর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি কোনোভাবেই ঈদের আবেগকে স্তিমিত করতে পারেনি। বরং আবহাওয়ার প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করেই জাতীয় ঈদগাহে মুসল্লিদের ঢল নামে। জামাত শুরুর আগেই পুরো মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক ইমামতি করেন বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু সূত্রে জামাতের আনুষ্ঠানিক সময় সকাল সাড়ে ৮টা বলা হলেও নামাজ শুরু হয় আনুমানিক ৮টা ৩৪ মিনিটে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রের উপস্থিতি কীভাবে জনআস্থার ভাষায় অনূদিত হয়। সাধারণ মানুষ যখন নিরাপত্তার কড়াকড়ির মধ্যেও নির্বিঘ্নে প্রধান জামাতে অংশ নেয়, তখন সেটি শুধু প্রশাসনিক সক্ষমতার প্রদর্শন নয়; বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার দৃশ্যমান সম্পর্কেরও পুনর্নির্মাণ। ঈদের মতো সর্বজনীন ধর্মীয় উৎসব সেই সম্পর্ককে আরও মানবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
সব মিলিয়ে, এবারের জাতীয় ঈদগাহের প্রধান জামাত ছিল শুধু একটি ইবাদতের আয়োজন নয়; এটি ছিল আবেগ, আস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল, রাজনৈতিক প্রতীক এবং জনসম্পৃক্ততার সম্মিলিত এক বড় জাতীয় মুহূর্ত। ঈদের এই কাতার তাই কেবল নামাজের কাতার নয়—এটি ছিল একটি বার্তা: মতপার্থক্য থাকলেও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্যের প্রতীক এখনো সম্ভব।