কাজল ইব্রাহিম | বঙ্গ নিউজ বিডি
দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার ভবানীপুর এলাকায় অবস্থিত বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে চরম অব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক শৈথিল্যের এক উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত উন্মোচিত হয়েছে। খনি প্রাঙ্গণে ধারণক্ষমতার তোয়াক্কা না করে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত কয়লা স্তূপীকরণের ফলে সৃষ্ট অস্বাভাবিক চাপ সহ্য করতে না পেরে গুরুত্বপূর্ণ সীমানা প্রাচীর ধসে পড়েছে। এ ধস কেবল অবকাঠামোগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং সুস্পষ্ট পরিকল্পনাহীনতা, তদারকি সংকট এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যবস্থাপনার নগ্ন প্রতিফলন।
প্রাচীর ধসের পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে ধাবিত হয়েছে। সাম্প্রতিক টানা বর্ষণে উন্মুক্ত অবস্থায় থাকা বিপুল পরিমাণ কয়লা ধুয়ে পাশ্ববর্তী ড্রেনে বিলীন হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অবলীলায় অপচয়ের এক নির্মম চিত্র তুলে ধরছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ড্রেনজুড়ে প্রবাহিত কালো পানির ধারা যেন জাতীয় সম্পদের নির্বাক বিসর্জনের প্রতীক। ইতোমধ্যেই কয়েক টন কয়লা অপচয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক অভিঘাত সৃষ্টি করছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ অনুযায়ী, খনিতে পর্যাপ্ত ও বিজ্ঞানসম্মত সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে প্রায়শই কয়লার স্তূপে স্বতঃস্ফূর্ত দাহ্যতা (Self-Ignition) সৃষ্টি হয়, যা একদিকে পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালানি সম্পদের অপূরণীয় ক্ষয় সাধন করছে। প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে—এত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার এহেন নাজুক অবস্থা কেন? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতা কোথায়?
ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার অবকাশ নেই; বরং এটি দেশের খনিজ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা, অদূরদর্শিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতাহীনতার প্রতিফলন। পর্যাপ্ত শেড, আধুনিক মজুতব্যবস্থা এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সুস্পষ্ট ঘাটতি এ সংকটকে আরও তীব্র করেছে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রহস্যজনক নীরবতা জনমনে ক্ষোভ ও উদ্বেগের সঞ্চার করছে, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্নকে আরও ঘনীভূত করছে।
বিশেষজ্ঞ মহল সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত ভেঙে পড়া প্রাচীর পুনর্নির্মাণ, আধুনিক ও সুরক্ষিত মজুতব্যবস্থা প্রবর্তন এবং কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি এভাবে অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কবলে পড়লে এর দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
জাতীয় সম্পদ সংরক্ষণে অবিলম্বে কার্যকর হস্তক্ষেপ, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের অনিবার্য দাবি। অন্যথায়, এ ধরনের অপচয় ও অবহেলার দায় ইতিহাস একদিন নির্মম বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।