নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৭ সালের এক-এগারো কেবল একটি তারিখ নয়, বরং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় গভীর ক্ষতচিহ্ন হয়ে থাকা এক অন্ধকার অধ্যায়। সেই সময়ের বহুল আলোচিত ও প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তাদের একজন, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, অবশেষে গ্রেপ্তার হয়েছেন। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ ২০২৬) ভোররাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।
এক-এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসি এবং পরে গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক। সে সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার এবং রাজনীতিকে নতুন কাঠামোয় ঢেলে সাজানোর যে চেষ্টা হয়েছিল, তার সঙ্গে তাঁর নাম বারবার উচ্চারিত হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বর্ণনায়, কথিত ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা ঘিরে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে কোণঠাসা করার যে প্রচেষ্টা দেখা গিয়েছিল, সেই বিতর্কিত অধ্যায়ের অন্যতম মুখ হিসেবেই তিনি পরিচিত।
রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল, এক-এগারোর সেই প্রকল্প ছিল কেবল ক্ষমতার রদবদল নয়; এটি ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক গতিপথকে ভেঙে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত প্রয়াস। বিএনপিপন্থী রাজনৈতিক বয়ানে দাবি করা হয়, সেই সময় বেগম খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা এবং তারেক রহমানসহ শীর্ষ নেতৃত্বকে টার্গেট করে যে দমননীতি চালানো হয়েছিল, তা দেশের রাজনীতিতে গভীর বিভাজন, অবিশ্বাস এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের জন্ম দেয়। নির্যাতন, জোরপূর্বক চাপ, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস—এসব অভিযোগ আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তীব্রভাবে আলোচিত। তবে এসব অভিযোগের অনেকাংশই রাজনৈতিক পক্ষগুলোর বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত, এবং সব দাবিই আদালতে প্রমাণিত—এমনটি বলা যাচ্ছে না।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেপ্তার তাই নিছক একটি আইনগত ঘটনা নয়—এটি অনেকের কাছে ইতিহাসের এক প্রতীকী প্রত্যাবর্তন। যে সময়কে অনেকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য কলঙ্কজনক অধ্যায় বলে মনে করেন, সেই সময়ের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তির গ্রেপ্তার নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে: এক-এগারোর নেপথ্য কুশীলবদের রাজনৈতিক ও নৈতিক দায় কি অবশেষে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হচ্ছে?
উল্লেখ্য, এক-এগারোর পরবর্তী সময়ে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার করা হয়, এবং পরবর্তী সরকারও তাঁর মেয়াদ বাড়িয়েছিল। পরে তিনি জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হন। ফলে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক কখনোই পুরোপুরি স্তিমিত হয়নি।
আজকের এই গ্রেপ্তার সেই পুরোনো প্রশ্নই আবার সামনে নিয়ে এসেছে—রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ক্ষমতার জোট বেঁধে যখন গণতন্ত্রকে পাশ কাটানো হয়, তখন ইতিহাস কি শেষ পর্যন্ত তার হিসাব চুকিয়েই নেয়?