বঙ্গ নিউজ বিডি ডেস্ক রিপোর্ট : দুনিয়াজুড়ে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুইটি—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব পায় ঈদুল ফিতর। এক কথায় “ঈদ” বললেই সাধারণভাবে মানুষ ঈদুল ফিতরকেই বুঝে থাকেন।
ঈদ কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়; বাংলাদেশে এটি এখন বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও কেন্দ্র। বছরে পণ্য ও সেবার মোট কেনাবেচার বড় একটি অংশ হয় ঈদকে ঘিরে। তবে ইসলামের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই ঈদের প্রচলন শুরু হয়নি; বরং নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এর প্রবর্তন ঘটে।
ইসলামের ইতিহাস গবেষকদের মতে, হিজরি দ্বিতীয় সনে ঈদুল ফিতরের প্রবর্তন হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক মো. আতাউর রহমান মিয়াজীর ভাষ্য অনুযায়ী, রোজা ফরজ হওয়ার পরই রমজান শেষে শাওয়ালের প্রথম দিনে ঈদ উদযাপনের বিধান আসে। ঐতিহাসিক হিসেবে মুসলমানরা মদিনায় প্রথম ঈদুল ফিতর পালন করেন ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে।
হাদিসে বর্ণিত আছে, মদিনায় এসে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) দেখেন, স্থানীয়রা বছরে দুইটি উৎসব পালন করত। তখন তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা এসবের পরিবর্তে মুসলমানদের জন্য আরও উত্তম দুইটি দিন নির্ধারণ করেছেন—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এভাবেই মুসলিম সমাজে দুই ঈদের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে।
ঈদের নামাজ প্রবর্তন নিয়ে আলেমদের মধ্যে দুটি অভিমত আছে। কেউ কেউ বলেন, প্রথম হিজরিতেই ঈদের নামাজ চালু হয়; তবে অধিকাংশ আলেমের মতে, দ্বিতীয় হিজরিতে এর বিধান কার্যকর হয়। কারণ, দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে রোজা ফরজ হয় এবং তার পরবর্তী শাওয়ালে প্রথম ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়।
প্রথম যুগের ঈদ আজকের মতো জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। তখন নতুন পোশাক, বিশাল কেনাকাটা কিংবা আলোকসজ্জার প্রবণতা ছিল না। তবুও ঈদের আনন্দ ছিল গভীর। নবীজি (সা.) ঈদের দিনে গোসল করে উত্তম পোশাক পরতেন, নামাজে যেতেন, নামাজ শেষে মিষ্টি আহার করতেন এবং আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও সঙ্গীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। শিশুদের আনন্দের দিকেও তিনি বিশেষ খেয়াল রাখতেন।
ঈদুল ফিতরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো সদকাতুল ফিতর বা ফিতরা। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, ঈদের নামাজের আগেই গরিব-দুঃখীদের ফিতরা প্রদান করতে হয়, যাতে তারাও ঈদের আনন্দে অংশ নিতে পারেন। আর ঈদের দিন সকালে দুই রাকাত নামাজ আদায় মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় আমলগুলোর একটি।
ঈদুল আজহাকে বাংলা ভাষায় অনেকে “কোরবানির ঈদ” বলেন। আরবি উচ্চারণে এটি “ঈদুল আজহা” বেশি শুদ্ধ, যদিও “ঈদ-উল আযহা” বা “ঈদ-উল আদহা” বানানও চলতে দেখা যায়। তবে প্রমিত বাংলা-আরবি রূপে “ঈদুল আজহা” ব্যবহারই বেশি গ্রহণযোগ্য।
বাংলার ইতিহাসে ঈদ শুরু থেকেই গণমানুষের সবচেয়ে বড় উৎসব ছিল না। ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের মতে, দেড়শ বছর আগেও এ অঞ্চলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ঈদ বড় সামাজিক উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা হাজী শরীয়তুল্লাহর সময় থেকে বঙ্গে উৎসবমুখর ঈদ পালনের ধারা জোরালো হতে শুরু করে।
মুঘল আমলে ঢাকায় শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে ঈদ উদযাপনের বিশেষ আয়োজন ছিল। ঈদের চাঁদ দেখা গেলে আনন্দ-উৎসব শুরু হতো, কামান দাগা হতো, আর ঈদের নামাজ শেষে শাসকরা হাতি বা ঘোড়ায় চড়ে বের হয়ে জনতার দিকে মুদ্রা ছুড়ে দিতেন। তবে এসব আয়োজন মূলত অভিজাত ও প্রশাসনিক পরিমণ্ডলকেন্দ্রিক ছিল; সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত।
ঐতিহাসিকদের মতে, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এ অঞ্চলে ঈদ আরও ব্যাপক সামাজিক উৎসবে রূপ নিতে শুরু করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধীরে ধীরে তা দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়। আগে ঈদের আনুষ্ঠানিকতার কেন্দ্র ছিল ঢাকা; এখন তা শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।
বর্তমানে ঈদ শুধু ধর্মীয় আবেগের উৎসব নয়, এটি বাংলাদেশে সামাজিক সম্প্রীতি, পারিবারিক পুনর্মিলন এবং বৃহৎ অর্থনৈতিক প্রবাহেরও প্রতীক। নতুন পোশাক, কেনাকাটা, যাতায়াত, উপহার, খাদ্যপণ্য, অনলাইন বেচাকেনা—সব মিলিয়ে ঈদ এখন দেশের সবচেয়ে বড় মৌসুমি অর্থনৈতিক আয়োজনে পরিণত হয়েছে।