এস এম জালাল সাইফুল : ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির পিলখানা হত্যাকাণ্ড—জাতির ইতিহাসে এক শোকাবহ ও কলঙ্কিত অধ্যায়। রাজধানীর পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তরে সংঘটিত সেই নারকীয় ঘটনায় প্রাণ হারান ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা। দীর্ঘ ১৭ বছর পরও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলাটি বিচারিক জটিলতায় আটকে থাকায় ক্ষোভ, বেদনা ও প্রশ্ন—সবই আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, চলমান সাক্ষ্যগ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের জবানবন্দিতে তৎকালীন সরকারের একাধিক শীর্ষ নেতার নাম উঠে এসেছে। গণমাধ্যমকে বিস্ফোরক মামলার চিফ প্রসিকিউটর বোরহান উদ্দিন জানিয়েছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ ফজলে নূর তাপস, মির্জা আজম এবং জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ তৎকালীন কয়েকজন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। এ প্রেক্ষিতে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানান তিনি।
বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় আসামির সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৮০০ জন। ১২০০ সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য নিয়েছেন প্রায় ৩০০ জনের। মামলাটি এখনো সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। ৫ আগস্টের পর কয়েকশ আসামি জামিন পেয়েছেন বলে জানা গেছে, যা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এর আগে ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর বিচারিক আদালতের রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তীতে হাইকোর্ট ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন, ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। খালাস পান ২৮৩ জন। তবে বিস্ফোরক মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিচার প্রক্রিয়া এখনও পূর্ণতা পায়নি।
পিলখানা ট্র্যাজেডি কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে। যদি সাক্ষ্যে উত্থাপিত অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা হবে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বড় মোড়। আর যদি অভিযোগ প্রমাণিত না হয়, তবে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত বয়ানের অবসান ঘটানোও সমান জরুরি।
জাতি আজ জানতে চায়—এই রক্তের দায় কার? বিচার কি কেবল কাগজে-কলমে, নাকি প্রকৃত অর্থেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে? পিলখানার শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের পরিবার এবং জাতির সামনে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।