বঙ্গ নিউজ বিডি প্রতিবেদক : ভারতের বিহার রাজ্যের পাটনার দারভাঙ্গার বাসিন্দা হাজী ফখরুদ্দিন। দেশভাগের পর ১৯৫৬ সালে জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়েই সপরিবারে পাড়ি জমান চট্টগ্রামে। জীবিকার স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না থাকলেও অদম্য মানসিকতা আর ভাগ্যান্বেষণের টানে ১৯৬৫ সালে ঢাকায় আসেন তিনি।
বিভিন্ন খণ্ডকালীন কাজের পর ১৯৬৬ সালে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ভিকারুননিসা নূন স্কুলে দারোয়ানের চাকরি পান হাজী ফখরুদ্দিন। সে সময় স্কুলটি বর্তমানের মতো বড় ছিল না, ছাত্রীসংখ্যাও ছিল তুলনামূলক কম। স্কুল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তিনি স্কুল প্রাঙ্গণে একটি ছোট ক্যান্টিন চালু করেন—যেখান থেকেই শুরু হয় ঢাকার এক কিংবদন্তির জন্ম।
রান্নায় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও দিল্লির নবাব পরিবারের পাচকদের উত্তরসূরি মুসলিম মিয়ার কাছে তালিম নিয়েছিলেন হাজী ফখরুদ্দিন। গুরুর শেখানো কৌশল আর নিজের স্বভাবজাত মেধার সমন্বয়ে অল্প সময়েই তাঁর রান্নার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। যাঁরা তাঁর রান্না খেয়েছেন, সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন—হাজী ফখরুদ্দিনের হাতে ছিল এক অনন্য জাদুর ছোঁয়া।
ক্রমেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ঢাকার কিংবদন্তি বাবুর্চি হিসেবে। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সেই ছোট ক্যান্টিন থেকেই জন্ম নেয় আজকের জনপ্রিয় ‘ফখরুদ্দিন বিরিয়ানি অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’।
বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় এই রেস্টুরেন্টের সাতটি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে মতিঝিলের জুট অ্যাসোসিয়েশন ভবনে একটি শাখা বিশেষভাবে পরিচিত। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সিঙ্গাপুরে চালু হয় ফখরুদ্দিন বিরিয়ানির প্রথম প্রবাসী শাখা।
১৯৯৫ সালে হাজী ফখরুদ্দিন বাবুর্চির ইন্তেকালের পর তাঁর দুই ছেলে হাজী মো. শফিক ও হাজী মো. রফিক পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রেখে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছেন। তাঁদের হাত ধরেই ফখরুদ্দিন বিরিয়ানির সুনাম ছড়িয়ে পড়ে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
বাংলাদেশের বাইরে জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর হয়ে জর্ডানের রাজপরিবারের অনুষ্ঠানেও পরিবেশিত হয়েছে ঢাকার এই বিখ্যাত বিরিয়ানি। এমনকি জর্ডানের রাজপরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠানের অতিথিরাও উপভোগ করেছেন ফখরুদ্দিন বিরিয়ানির স্বাদ।
ঢাকায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল সংলগ্ন আদি কেন্দ্র ছাড়াও মগবাজার, গুলশান-১, ধানমন্ডি, মতিঝিল, বনানী ও উত্তরা এবং চট্টগ্রামে শাখা রয়েছে। এছাড়া একসময় সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই ও লন্ডনেও ‘ফখরুদ্দিন বিরিয়ানি অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’-এর শাখা চালু ছিল।
একজন দারোয়ান থেকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত এক ব্র্যান্ড—হাজী ফখরুদ্দিনের জীবনগাঁথা আজও প্রমাণ করে, স্বপ্ন আর পরিশ্রম থাকলে অসম্ভব বলে কিছু নেই।