নিজস্ব প্রতিবেদক : পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন ঘুম ভাঙার পর থেকেই শিশু-কিশোরদের মনে যে আনন্দটা সবচেয়ে বেশি দোলা দেয়, তার একটি হলো ঈদি, সালামি বা আরব বিশ্বের ভাষায় ‘ঈদিয়া’। নতুন পোশাক, সেমাই আর আত্মীয়স্বজনের কোলাহলের পাশাপাশি এই ছোট্ট উপহারটিও ঈদের আবেগকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত। বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা পরিবারের বড়দের কাছ থেকে পাওয়া এই সালামি কেবল অর্থের অঙ্ক নয়; এটি স্নেহ, ভালোবাসা, দোয়া ও পারিবারিক বন্ধনের এক উজ্জ্বল প্রকাশ।
ঐতিহাসিক বর্ণনা বলছে, ‘ঈদিয়া’ শব্দটি এসেছে ‘ঈদ’ থেকে, যার অর্থ উৎসব-উপলক্ষ্যে দেওয়া উপহার বা অনুদান। ইতিহাসের পাতায় এর শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় মিসরের ফাতেমীয় আমলে, অর্থাৎ হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর শেষ দিকে, যা খ্রিষ্টীয় দশম শতকের সমকাল। সে সময় ঈদ উপলক্ষে সাধারণ মানুষের মধ্যে অর্থ, পোশাক ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণের রেওয়াজ চালু হয়। তখন এই উপহারকে বিভিন্ন নামে ডাকা হতো—কখনও ‘রুসুম’, কখনও ‘তাওসিয়া’। রাজপরিবারের সদস্যরা পেতেন স্বর্ণ দিনার, আর শিশুদের দেওয়া হতো উপহার ও অর্থ।
ফাতেমীয় যুগের ইতিহাসবিদদের বিবরণে জানা যায়, খলিফা আল-মু‘ইয লি-দীনিল্লাহ আল-ফাতেমী মিসরে শাসন শুরু করার পর মানুষের হৃদয় জয় করতে ঈদকেন্দ্রিক নানা আয়োজন চালু করেন। তিনি মিষ্টি বিতরণ, ভোজের আয়োজন, নগদ অর্থ ও পোশাক উপহার দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ঈদের নতুন পোশাক প্রস্তুতের কাজও শুরু হতো বেশ আগেভাগে, যেন ঈদের আগের রাতেই তা মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া যায়। এমনকি ইতিহাসে উল্লেখ আছে, হিজরি ষষ্ঠ শতকে শুধু পোশাক তৈরির জন্যই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ দিনার বরাদ্দ করা হতো।
ইসলামি ইতিহাস বিশ্লেষকদের মতে, ফাতেমীয় যুগেই মিশরে ধর্মীয় উৎসবগুলোকে জনসম্পৃক্ত ও বর্ণাঢ্য রূপ দেওয়া হয়। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা তখনও মুসলিম বিশ্বের প্রধান উৎসব ছিল, কিন্তু ফাতেমীয়রা এই উৎসবের সঙ্গে নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতি সংযোজন করেন। সেই ধারাবাহিকতায় ঈদ উপলক্ষে খাদ্য, মিষ্টান্ন, পোশাক ও অর্থ বিতরণ এক বিশেষ সামাজিক ঐতিহ্যে রূপ নেয়।
ঐতিহাসিক সূত্রে আরও জানা যায়, ‘দার আল-ফিতরা’ নামে একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে ফিতরাহ, মিষ্টান্ন, পোশাক ও নানা খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হতো। ঈদের দিন প্রাসাদের সুবিশাল কক্ষে ভোজেরও আয়োজন থাকত। শুধু সাধারণ মানুষই নন, আলেম, কুরআন তিলাওয়াতকারী ও মুয়াজ্জিনদেরও বিশেষ সম্মাননা হিসেবে রূপার মুদ্রা দেওয়া হতো। এমনকি শাসক ও সম্ভ্রান্তদের মাঝেও ঈদের উপহার বিনিময়ের প্রথা ছিল।
পরবর্তীতে মামলুক যুগে এই উপহার আরও আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। তখন একে বলা হতো ‘জামকিয়া’। এটি শুধুমাত্র শিশুদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না; সৈন্য, কর্মকর্তা, রাজপুত্র—সবার জন্যই ঈদ উপলক্ষে বিশেষ ভাতা বরাদ্দ থাকত। ধারণা করা হয়, ‘জামকিয়া’ শব্দটি তুর্কি ‘জামা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ পোশাক। অর্থাৎ এই অর্থের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ঈদের জন্য নতুন পোশাক কেনার সক্ষমতা তৈরি করা।
ওসমানীয় বা অটোমান যুগে এসে ঈদিয়া আর কেবল রাষ্ট্রীয় ভাতা বা শাসকের আনুকূল্য হিসেবে রইল না; বরং তা মানুষের জীবনে সামাজিক ও পারিবারিক রীতিতে পরিণত হয়। ধীরে ধীরে এটি পরিবারকেন্দ্রিক ভালোবাসা প্রকাশের এক সহজ উপায়ে রূপ নেয়। নগদ অর্থের পাশাপাশি খাবার, পোশাক, মিষ্টি ও নানা উপহারও এই ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে। আধুনিক যুগে এসে সেটিই আমাদের পরিচিত সালামি বা ঈদি—যেখানে পরিবারের বড়রা ছোটদের হাতে আনন্দভরা কিছু অর্থ তুলে দেন।
বাংলাদেশে আমরা যাকে ‘সালামি’ নামে চিনি, আরব বিশ্বের বহু দেশে সেটি এখনও ‘ঈদিয়া’ নামেই পরিচিত। সৌদি আরব, জর্ডান, সিরিয়া, ইরাক, কুয়েত ও মিশরে এই নামটির প্রচলন রয়েছে। আবার কিছু অঞ্চলে নামের ভিন্নতাও দেখা যায়। ওমানে এটি ‘আয়্যুদ’, তিউনিসিয়ায় ‘মাহবাত আল-ঈদ’ এবং মরক্কোয় ‘ফলুস আল-ঈদ’ নামে পরিচিত।
ঈদিয়ার গুরুত্ব কেবল আর্থিক নয়, এর রয়েছে গভীর মানসিক ও সামাজিক তাৎপর্য। মনোবিজ্ঞানীদের ভাষায়, ঈদের উপহার ভালোবাসা ও আন্তরিকতার অনুভূতি জাগায়, সম্পর্ককে করে আরও দৃঢ়। শিশুদের মধ্যে এটি আনন্দ সৃষ্টি করে, একই সঙ্গে খরচ, সঞ্চয় ও দায়িত্ববোধের প্রাথমিক শিক্ষা দেয়। অনেক পরিবার শিশুদের শেখান—ঈদির টাকার একটি অংশ নিজের জন্য, একটি অংশ সঞ্চয়ের জন্য এবং আরেকটি অংশ প্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করার জন্য।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, ঈদির সৌন্দর্য তার অঙ্কে নয়, অনুভূতিতে। যদি এটি সামাজিক প্রতিযোগিতা, তুলনা বা বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়, তাহলে আনন্দের বদলে মানসিক চাপও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক কষ্টে থাকা পরিবারের জন্য অতিরিক্ত সামাজিক চাপ ঈদের প্রকৃত আনন্দকে ম্লান করে দিতে পারে। তাই ইসলামের সৌন্দর্য ও পারিবারিক ঐতিহ্যের আলোকে ঈদির আসল তাৎপর্য হওয়া উচিত স্নেহ, দোয়া, আন্তরিকতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়া।
ঈদের দিনে ছোট্ট একটি খাম, হাতে গুঁজে দেওয়া কিছু টাকা বা সামান্য উপহার—এসবের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে এক বিশাল আবেগের জগৎ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এই ঐতিহ্য আজও আমাদের শেখায়, ঈদ কেবল উৎসব নয়; এটি হৃদয়ের বন্ধন দৃঢ় করারও এক মোক্ষম সময়।
ইসলামী কণ্ঠের কথা হলো—ঈদি হোক ভালোবাসার বাহন, অপচয়ের নয়; স্নেহের প্রকাশ, অহংকারের নয়; আর ঈদের আনন্দ হোক সামর্থ্য, সৌন্দর্য ও সুন্নাহসম্মত সংযমে পরিপূর্ণ।