নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় চীনা দূতাবাসের উদ্যোগে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝে ঈদ উপহার হিসেবে খাবার বিতরণ—উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল থেকে এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম বাংলাদেশে সামাজিক সহমর্মিতা বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, একটি ভালো উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে এসে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে—যা শুধু আয়োজকদের নয়, আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল—যা স্বাভাবিক প্রটোকলের অংশ। কারণ, এ ধরনের আয়োজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমেই অধিক কার্যকর হয়। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, সেই সম্পৃক্ততা যেন দায়িত্ববোধের বদলে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় রূপ নিয়েছে।
ঘটনাস্থলের দৃশ্য ছিল উদ্বেগজনক। প্রকৃত দুস্থ ও অসহায় মানুষের জন্য নির্ধারিত খাবারের প্যাকেটগুলো আগেভাগেই দখল করে বসে ছিলেন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নারী-পুরুষ নেতাকর্মীরা। কেউ কেউ আবার ইফতার শুরুর আগেই প্যাকেট নিয়ে স্থান ত্যাগ করেছেন।
এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—যারা এই সহায়তা গ্রহণ করছেন, তারা কি সত্যিই সেই অভাবী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি? নাকি রাজনৈতিক পরিচয়ের সুযোগে ‘দুস্থ’ পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে?
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ঘটনাটি বিদেশি আয়োজকদের সামনেই ঘটেছে। এতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি মানবিক উদ্যোগের স্বচ্ছতা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই—একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব কি ছিল না প্রকৃত সুবিধাবঞ্চিতদের সেখানে উপস্থিত করা? যদি সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না হয়ে থাকে, তবে এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, নৈতিক বিচ্যুতিও বটে।
ঘটনার পর এটিকে ‘যৌথ উদ্যোগ’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা এবং পরে চীনা দূতাবাসের পক্ষ থেকে একক আয়োজন বলে স্পষ্টীকরণ—এই দ্বৈত অবস্থান আরও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। এতে স্বচ্ছতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যে দলটি ইসলামী আদর্শ, নৈতিকতা ও জনকল্যাণের কথা বলে—তাদের কাছ থেকে এমন স্ববিরোধী আচরণ জনমনে হতাশা তৈরি করাই স্বাভাবিক। কারণ, নৈতিক রাজনীতি কেবল বক্তব্যে নয়, আচরণেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।
এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো—মানবিক কার্যক্রমকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে তার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। বরং এতে সমাজে বৈষম্য ও অবিশ্বাস আরও বাড়ে।
এখন সময় এসেছে আত্মসমালোচনার। মানবিক উদ্যোগকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা, প্রকৃত উপকারভোগীদের নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক সততা বজায় রাখা—এই তিনটি বিষয়ই হওয়া উচিত সকল পক্ষের অগ্রাধিকার।
নচেৎ, ভালো উদ্যোগও প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকবে—আর ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই মানুষগুলো, যাদের জন্য এসব আয়োজন।