বঙ্গ নিউজ বিডি প্রতিনিধি : জুলাই ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নিহত অজ্ঞাতপরিচয়ের শহীদদের কবর অবশেষে শনাক্ত হলো। দীর্ঘ ১৮ মাস অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার পর প্রিয়জনের কবরের সন্ধান পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। রায়েরবাজার কবরস্থানে সোমবার (৫ জানুয়ারি) এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ও আদালতের নির্দেশে পরিচালিত মরদেহ উত্তোলন ও শনাক্তকরণ কার্যক্রমের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৮ জন শহীদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। আরও একটি মরদেহের পরিচয় শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর রায়েরবাজার কবরস্থান থেকে এ পর্যন্ত ১১৪ জন অজ্ঞাতপরিচয়ের মরদেহ উত্তোলন, ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ সম্পন্ন হয়েছে।
সোমবার রায়েরবাজার কবরস্থানে আয়োজিত ‘অজ্ঞাতপরিচয়ের শহীদদের মরদেহ পরিচয় শনাক্তকরণ’ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানান সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ। তিনি বলেন, ভুক্তভোগী ৯টি পরিবারের দেওয়া ডিএনএ নমুনার ভিত্তিতে ৮ জন শহীদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।
পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর আটটি পরিবারের কাছে নিজ নিজ স্বজনের কবর বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় কবর জড়িয়ে ধরে আহাজারিতে ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।
যাদের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে
ডিএনএ পরীক্ষায় যেসব শহীদের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে তারা হলেন—
ঢাকা মাদারটেকের শহীদ কাবিল হোসেন (৫৮)
ঢাকার মোহাম্মদপুরের শহীদ সোহেল রানা (৩৮)
শেরপুরের শহীদ আসাদুল্লাহ (৩১)
ফেনীর শহীদ রফিকুল ইসলাম (২৯)
ময়মনসিংহের শহীদ মাহিম (৩২)
কুমিল্লার শহীদ ফয়সাল সরকার (২৬)
পিরোজপুরের শহীদ রফিকুল ইসলাম (৫২)
চাঁদপুরের শহীদ পারভেজ বেপারী (২৩)
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা উপদেষ্টা ফারুক ই আজম, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমানসহ সংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক মানে ফরেনসিক তদন্ত
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণ-অভ্যুত্থানে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে নিহত বহু ব্যক্তির মরদেহ অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে শহীদ পরিবারগুলোর দাবি ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে মরদেহ উত্তোলন ও শনাক্তকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে এই সংবেদনশীল কার্যক্রমের সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডিকে।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফরেনসিক অ্যানথ্রোপোলজিস্ট ও কনসালটেন্ট ড. লুইস ফনডেরিডার-এর প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় গত বছরের ৭ ডিসেম্বর থেকে মরদেহ উত্তোলন কার্যক্রম শুরু হয়।
এছাড়া বিচারবহির্ভূত ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ড বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার বাংলাদেশ সফরকালে সিআইডির ফরেনসিক ও ডিএনএ টিমকে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।
মিনেসোটা প্রটোকল অনুসরণ
মরদেহ উত্তোলন, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ, প্রোফাইলিং ও পুনঃসমাধিস্থকরণ—সমগ্র প্রক্রিয়া মিনেসোটা প্রটোকল অনুসরণ করে সম্পন্ন করা হয়েছে, যা মানবাধিকারভিত্তিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা হিসেবে স্বীকৃত।
গত ৭ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত রায়েরবাজার কবরস্থানে অস্থায়ী মর্গ স্থাপন করে এই বৃহৎ ফরেনসিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
মানবাধিকার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত
এই কার্যক্রমে সিআইডির পাশাপাশি ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি), নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে।
রায়েরবাজারে পরিচালিত এই বৃহৎ পরিসরের ফরেনসিক উদ্যোগ বাংলাদেশে মানবাধিকারভিত্তিক তদন্ত ও ভবিষ্যৎ বিচারিক প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে শহীদ পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা অনেকাংশে দূর হলো এবং ন্যায়বিচারের পথ আরও সুদৃঢ় হলো।