নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, ৩ মে ২০২৬ : নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুতর দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ, আর প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পাচ্ছে আসামিরা।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাক-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা’ বিষয়ক এই গবেষণার ফলাফল শনিবার (২ মে) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় উপস্থাপন করা হয়।
সভায় জানানো হয়, নিষ্পত্তিকৃত মামলাগুলোর মধ্যে ১৩ শতাংশ আপসের মাধ্যমে শেষ হয়েছে। আইনে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির কথা থাকলেও বাস্তবে গড়ে সময় লাগছে প্রায় ১,৩৭০ দিন বা ৩.৭ বছর। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার পর্যন্ত তারিখ পড়ছে।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিচার বিভাগ দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি হলেও বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে এটি উপেক্ষিত। সীমিত বাজেটে বিচারকদের বেতন, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যয় পরিচালনা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আরও জানান, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ মামলা রয়েছে, যা কমিয়ে ৪ লাখে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। তবে মামলা দীর্ঘায়িত হওয়া, শাখা-প্রশাখা বৃদ্ধি এবং কিছু ক্ষেত্রে আইনজীবীদের কারণে জট কমছে না।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, বিচারব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনতে শুধু বাজেট বাড়ানো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং সমন্বিত উদ্যোগ। তিনি ‘এক সরকার’ ধারণার ওপর জোর দিয়ে বলেন, পুলিশ, চিকিৎসক ও বিচার বিভাগের সমন্বয়ে ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, কম সাজার হার মানেই সব মামলা মিথ্যা নয়। বাস্তবে সামাজিক চাপ, ভয় ও কলঙ্কের কারণে প্রায় ৭০ শতাংশ ভুক্তভোগীই আদালতে আসেন না। ফলে অনেক মামলাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
গবেষণায় বিচার বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে—সাক্ষী ও অভিযোগকারীর অনুপস্থিতি, ঘনঘন সময় প্রার্থনা, তদন্তে বিলম্ব, দুর্বল প্রমাণ ব্যবস্থা এবং সাক্ষী সুরক্ষার অভাব।
এছাড়া, আইন সংশোধনের মাধ্যমে সময়সীমা ১৮০ দিন থেকে কমিয়ে ৯০ দিন করা হলেও বাস্তব প্রতিবন্ধকতা দূর না হলে এর সুফল পাওয়া কঠিন বলে মত দেন গবেষকরা।
প্রধান সুপারিশগুলো হলো:
মামলার সময়সীমা কঠোরভাবে তদারকি ও অপ্রয়োজনীয় মুলতবি কমানো
দ্রুত ফরেনসিক ও মেডিকেল রিপোর্ট নিশ্চিত করা
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি
প্রসিকিউটরদের কার্যক্রম মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু
ভুক্তভোগী-সংবেদনশীল ও গোপনীয় বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা
আইনি সহায়তা, কাউন্সেলিং ও আশ্রয়কেন্দ্র সম্প্রসারণ
বেশি চাপযুক্ত জেলায় ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বৃদ্ধি
গবেষণাটি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের ৩২টি জেলার ৪,০৪০টি নিষ্পত্তিকৃত মামলার তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কার্যকর সংস্কার ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।