আবুল হাসনাত তুহিন ফেনী:- “ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা” এই বিশ্বাসকে ধারণ করে দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে তায়কোয়ানডো অঙ্গনে কাজ করে যাচ্ছেন দেশের অন্যতম সফল নারী ক্রীড়াবিদ, প্রশিক্ষক ও রেফারি আমেনা বেগম (প্রিয়া)। দক্ষিণ কোরিয়ার কুক্কিওয়ান থেকে অর্জন করেছেন ব্ল্যাক বেল্ট ৫ম ডান। বর্তমানে তিনি জাতীয় ক্রীড়াবিদ, জাতীয় রেফারি, তায়কোয়ানডো কোচ এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ফেনী জেলার রাজাপুর গ্রামে ১৯৮০ সালের ২২ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন আমেনা বেগম প্রিয়া। মাত্র দুই বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৯৭ সালে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তায়কোয়ানডো প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হয়ে কোরিয়ান মার্শাল আর্ট তায়কোয়ানডোর সঙ্গে তার পথচলা শুরু হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজেকে একজন দক্ষ ক্রীড়াবিদ হিসেবে গড়ে তোলেন।
১৯৯৭-৯৮ সালে জাতীয় তায়কোয়ানডো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে রৌপ্য পদক অর্জন করেন তিনি। সে সময় বাংলাদেশ তায়কোয়ানডো ফেডারেশনের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন নেপালের মি. টারজান সুভা এবং ফেডারেশনের নেতৃত্বে ছিলেন মাহমুদুল ইসলাম রানা।
২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক মাসের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে যান আমেনা বেগম প্রিয়া। কঠোর অনুশীলন ও পরীক্ষার মাধ্যমে সেখানে ব্ল্যাক বেল্ট ১ম ডান অর্জন করেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
দেশে ফিরে একই বছর ঢাকার মহাখালী ও বনানীতে তায়কোয়ানডো প্রশিক্ষণ ক্লাব পরিচালনা শুরু করেন। ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশ তায়কোয়ানডো ফেডারেশনের জাতীয় রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
২০১০ সালে ঢাকার উত্তরায় প্রতিষ্ঠা করেন “বাংলাদেশ তায়কোয়ানডো ট্রেনিং একাডেমি”। বর্তমানে একাডেমির বিভিন্ন শাখায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তায়কোয়ানডো প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। তার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষার্থী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দেশের জন্য সুনাম বয়ে এনেছে।
ক্রীড়া জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তি জীবনেও সফল আমেনা বেগম প্রিয়া। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করে আইন পেশাতেও যুক্ত হন। একই সঙ্গে পরিবার ও পেশাগত জীবনকে সমান দক্ষতায় পরিচালনা করে যাচ্ছেন।
তার একমাত্র কন্যা নুহরাতুন নাইমা ইসলামও মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তায়কোয়ানডোতে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি বাংলাদেশ তায়কোয়ানডো ফেডারেশন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কুক্কিওয়ান থেকে ব্ল্যাক বেল্ট ৩য় ডান অর্জন করেছেন। ২০২৫ সালে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ৮ম আন্তর্জাতিক হিরোজ কাপ চ্যাম্পিয়নশিপে রৌপ্য পদক লাভ করেন।
বাংলাদেশ তায়কোয়ানডো ফেডারেশনের সদস্য আমেনা বেগম প্রিয়া দক্ষিণ কোরিয়ায় তায়কোয়ানডোর বিশ্ব সদর দপ্তর কুক্কিওয়ান থেকে ব্ল্যাক বেল্ট ৫ম ডান অর্জন করেন। জাতীয় রেফারি ও প্রশিক্ষক হিসেবে তার সুনাম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়েছে।
বর্তমানে তিনি লর্ডস এন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল এবং মোহাম্মদপুরের অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে তায়কোয়ানডো প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ফেনীর কৃতি সন্তান আমেনা বেগম প্রিয়া ২০২৫ সাল থেকে ফেনী জেলায় একাধিক তায়কোয়ানডো প্রশিক্ষণ একাডেমি চালু করেছেন। জেলা প্রশাসন ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহযোগিতায় তায়কোয়ানডো প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণে কাজ করছেন তিনি। তার বিশ্বাস, তায়কোয়ানডো শুধু একটি খেলা নয়, এটি সুস্থ জীবন, আত্মবিশ্বাস, আত্মরক্ষা এবং কর্মসংস্থানের একটি কার্যকর মাধ্যম।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ফেনী জেলায় একটি শক্তিশালী তায়কোয়ানডো দল গড়ে তুলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করতে চান। পাশাপাশি শরীরচর্চা, যোগব্যায়াম ও মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নতুন প্রজন্মকে সুস্বাস্থ্য, মাদকমুক্ত জীবন ও আত্মবিশ্বাসী নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই তার অন্যতম লক্ষ্য।
তায়কোয়ানডোকে দেশের আরও জনপ্রিয় ও পেশাভিত্তিক ক্রীড়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন এই সফল নারী ক্রীড়াবিদ।