প্রতিবেদন: M A Hussain
Founder Editor, Arafatnews UK
বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সাধারণত ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তান আমলকে কেবল শোষণ-বঞ্চনার সময় হিসেবে তুলে ধরা হয়। নিঃসন্দেহে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়েছিল। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে সেই সময়কালে পূর্ব বাংলায় শিক্ষা, শিল্প, অবকাঠামো এবং সামরিক-প্রশাসনিক খাতে উল্লেখযোগ্য কিছু উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল, যার সুফল আজও বাংলাদেশ ভোগ করছে।
ব্রিটিশ শাসনের প্রায় ২০০ বছরে পূর্ব বাংলায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয়—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়। একইভাবে প্রকৌশল শিক্ষা, মেডিকেল শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার বিস্তারেও পাকিস্তান আমলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়।
পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত বহু প্রতিষ্ঠান—যেমন বুয়েট, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, কমলাপুর রেলস্টেশন, কুর্মিটোলা বিমানবন্দর, বাংলাদেশ সচিবালয়ের ভবনসমূহ, শিল্প এলাকা ও অসংখ্য জুট মিল—স্বাধীন বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
এছাড়া শিল্প উন্নয়নের লক্ষ্যে গড়ে ওঠে East Pakistan Industrial Development Corporation (EPIDC), যার মাধ্যমে জুট মিল, টেক্সটাইল মিল, নিউজপ্রিন্ট মিল, তেল শোধনাগার এবং শিল্প কারখানার বিস্তার ঘটে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সেচ প্রকল্প এবং নগর পরিকল্পনায়ও পাকিস্তান আমলে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পোশাক শিল্প, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক উন্নয়নে অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। স্বাধীনতার পর সাক্ষরতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, গড়ে উঠেছে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছে।
তবে সমালোচকরা মনে করেন, স্বাধীনতার ৫০ বছরের বেশি সময় পরও শিল্পায়ন ও উচ্চশিক্ষায় যে অগ্রগতি হওয়া উচিত ছিল, তা প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি। পাকিস্তান আমলে গড়ে ওঠা বহু শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বা দুর্বল হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে আত্মপরিচয় ও সার্বভৌমত্ব পেয়েছে, যা অমূল্য। তবে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে অতীতের অর্জন ও বর্তমানের সম্ভাবনাকে সমন্বিত করতে হবে। ইতিহাসকে কেবল আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য ও বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করা জরুরি।
বাংলাদেশের উন্নয়নকে আরও শক্তিশালী করতে হলে প্রয়োজন শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিল্পায়নের পুনর্জাগরণ, দক্ষ নেতৃত্ব এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। অতীতের অর্জনকে অস্বীকার না করে এবং বর্তমানের সাফল্যকে মূল্যায়ন করে ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করাই হবে একটি দায়িত্বশীল জাতির পরিচয়।