এসব এম শাহ্ জালাল সাইফুল :
নতুন সংসদ সদস্যদের শপথের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে জাতীয় সংসদ। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভাও দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তবে সরকার গঠনের পরপরই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে—রাষ্ট্রপতি পদে কোনো পরিবর্তন আসছে কি না।
বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ও সাংবিধানিক বাস্তবতা
বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের এপ্রিলে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার মেয়াদ রয়েছে ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। ফলে সংবিধান অনুযায়ী, তিনি পদে বহাল থাকলে নির্ধারিত সময়ের আগে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ নেই।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন হয়নি। বরং অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ থেকে শুরু করে সদ্য গঠিত বিএনপি সরকারের শপথও তিনি পাঠ করিয়েছেন। যদিও ছাত্র-জনতার একাংশ তার পদত্যাগ দাবি করেছিল।
গত ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন—নির্বাচনের পর তিনি সরে দাঁড়াতে আগ্রহী। তবে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পদত্যাগপত্র জমা দেননি।
রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হওয়ার তিন পথ
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হতে পারে তিনভাবে—
১. মেয়াদ শেষ হলে
২. পদত্যাগ করলে
৩. অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণ হলে
সংবিধান বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে তা স্পিকারের কাছে জমা দিতে হয়। সে ক্ষেত্রে অভিশংসনের প্রয়োজন পড়ে না। তবে পদত্যাগ না করলে অভিশংসন প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন যেভাবে
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন এবং সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালন করতে পারেন। সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ‘নির্বাচনী কর্মকর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করে তফসিল ঘোষণা করা হয়। প্রার্থী হতে হলে কমপক্ষে ৩৫ বছর বয়সী এবং সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য হতে হবে। একজন প্রস্তাবক ও একজন সমর্থকের প্রয়োজন হয়।
একক প্রার্থী হলে ভোটগ্রহণ ছাড়াই তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করা যায়।
ক্ষমতার ভারসাম্য: জুলাই সনদের প্রস্তাব
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। তবে সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত রয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর প্রণীত জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে—সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে আরও স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে।
তবে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার কাঠামোয় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম।
রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তনের প্রশ্নটি সামনে আসতে পারে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার পর। তবে রাষ্ট্রপতি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে বা অভিশংসন না হলে দ্রুত পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুব কম।
নতুন সরকারের রাজনৈতিক কৌশল, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রপতির নিজস্ব অবস্থান—এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্রপতি পদে আদৌ পরিবর্তন আসবে কি না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তনের সুযোগ নেই। তাই আপাতত রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও বাস্তবে পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।