এস এম শাহ্ জালাল সাইফুল :
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান–এর হাতে প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে দলটির উত্থান শুধু সাংগঠনিক শক্তির প্রকাশই ছিল না, বরং একটি আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক ধারার প্রতিষ্ঠাও ছিল। সেই সূচনালগ্ন থেকেই দলের আদর্শ, শৃঙ্খলা ও নীতিনিষ্ঠ রাজনীতির ভিত্তি গঠনে যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের অন্যতম নাম ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
ড. মোশাররফ হোসেন একাধারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি একাডেমিক অঙ্গনে সুনাম অর্জন করেন। শিক্ষকতা থেকে রাজনীতিতে আসা তাঁর পথচলা ছিল আদর্শনিষ্ঠ ও পরিকল্পিত—রাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সক্রিয় অংশগ্রহণই তাঁকে রাজনীতির মূলধারায় নিয়ে আসে।
১৯৮০–এর দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং ধীরে ধীরে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। পাঁচবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা যেমন প্রমাণিত, তেমনি তিনবারের মন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতাও সুপ্রতিষ্ঠিত। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, স্বরাষ্ট্র এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে তিনি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তে সম্পৃক্ত ছিলেন।
বিশেষ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর ১৫৬টি রাষ্ট্রের ভোটে সংস্থাটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন—যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার এক অনন্য স্বীকৃতি। জাতীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেও তাঁর নেতৃত্বের স্বীকৃতি মেলে।
দলীয় রাজনীতিতে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–এর আস্থাভাজন নেতা হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে তিনি কৌশলগত সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক সংলাপ ও সাংগঠনিক ঐক্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন।
ড. মোশাররফ হোসেনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো—পরিমিতভাষী ও মার্জিত আচরণ, নীতিনিষ্ঠ অবস্থান, সংকটকালে ধৈর্যশীল নেতৃত্ব, দলীয় ঐক্য রক্ষায় সক্ষমতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার। একই সঙ্গে ইসলামী মূল্যবোধ লালন ও জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে তাঁর ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তাঁকে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করেছে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর নাম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ—রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় উঠে আসছে। “এমপি হলে মন্ত্রী পাই, এবার ইনশাল্লাহ প্রেসিডেন্ট পাব”—রাজনৈতিক অঙ্গনে উচ্চারিত এ বক্তব্য নতুন এক প্রত্যাশার ইঙ্গিত বহন করছে। বিশ্লেষকদের মতে, অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার সমন্বয়ে তিনি ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর সাংবিধানিক দায়িত্বে আসীন হলে জাতীয় ঐক্য, স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন প্রয়োজন পরিমিত, অভিজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব—যিনি দলীয় সীমারেখা অতিক্রম করে রাষ্ট্রের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন। সেই আলোচনায় ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম ক্রমেই উচ্চারিত হচ্ছে আরও জোরালোভাবে। সময়ই বলবে, অভিজ্ঞতার দীর্ঘ পথচলা তাঁকে কোন নতুন অধ্যায়ের দিকে নিয়ে যায়।