নিজস্ব প্রতিবেদক:
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বপালনের সমাপ্তি টানলেন ড. মুহাম্মাদ ইউনূস। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ৯টায় জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে তিনি বলেন, “আমি আজ আমার কাজ থেকে বিদায় নিতে আপনাদের সামনে এসেছি। আমাদের প্রথম কাজ ছিল দেশকে সচল করা—এটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ।”
দীর্ঘ ১৮ মাসের দায়িত্বপালন শেষে একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাক্কালে দেওয়া এ ভাষণ শুধু আনুষ্ঠানিক বিদায় নয়; বরং এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের উপসংহার এবং নতুন যাত্রার সূচনার বার্তা।
নির্বাচন: ‘ভবিষ্যতের উৎকৃষ্ট উদাহরণ’
ভাষণের শুরুতেই দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ভোটার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি “প্রশংসনীয় নজির” স্থাপিত হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নির্বাচন কেমন হওয়া উচিত—এই নির্বাচন তারই উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে।
‘৫ আগস্ট’: মুক্তির দিন, কিন্তু অচল রাষ্ট্র
বিদায়ের দিনে ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ স্মরণ করে ড. ইউনূস বলেন, সেটি ছিল “মহা মুক্তির দিন”—দেশ-বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা আনন্দে অশ্রু ঝরিয়েছিল। তরুণ ছাত্রছাত্রীরা “দৈত্যের গ্রাস” থেকে দেশকে মুক্ত করলেও তখন রাষ্ট্রযন্ত্র ছিল সম্পূর্ণ অচল।
তিনি উল্লেখ করেন, সেই অচল দেশকে সচল করা, প্রশাসনকে পুনর্গঠন করা এবং আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠাই ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ।
‘জুলাই সনদ’: রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ভিত্তিপ্রস্তর
অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন ‘জুলাই সনদ’-এর কথা। তাঁর ভাষায়, গণভোটে বিপুল সমর্থনের মাধ্যমে এর বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সনদ কার্যকর হলে “ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব পথ চূড়ান্তভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদ শুধু একটি নীতিপত্র নয়—এটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের কাঠামো নির্মাণের প্রস্তাবনা। তবে বাস্তবায়নের পথ কতটা সুগম হবে, তা নির্ভর করবে নতুন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর।
বিদায় নয়, দায়বদ্ধতার অঙ্গীকার
ভাষণের শেষাংশে ড. ইউনূস দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা উল্লেখ করে বলেন, জনগণের অর্পিত দায়িত্ব তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের চেষ্টা করেছেন। যদিও তাঁর বক্তব্যে আত্মতুষ্টির সুর নেই; বরং একটি পরিবর্তিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি রচনার দাবি স্পষ্ট।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যায় শেষ হলেও দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন নতুন মোড়ে। নির্বাচিত সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—গণভোটে গৃহীত সনদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটানো।
ড. ইউনূসের বিদায় ভাষণ তাই কেবল দায়িত্ব সমাপ্তির ঘোষণা নয়; এটি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক পরীক্ষাকালের সমাপ্তি এবং গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার নতুন অধ্যায়ের সূচনা।