আন্তর্জাতিক ডেস্ক রিপোর্ট : গত অন্তত ছয় বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে এক ধরনের ‘ছায়াযুদ্ধ’ চলছিল। বিশেষ করে ২০২০ সালে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা Qasem Soleimani নিহত হওয়ার পর এই উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়।
তবে এই দীর্ঘ সময়জুড়ে তেহরানের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত হিসাবকৃত ও নিয়ন্ত্রিত। নিজেদের সামরিক সক্ষমতার বার্তা দেওয়া হলেও, সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকার কৌশলই ছিল ইরানের মূল নীতি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল ইরানের বাস্তববাদী বা প্র্যাগমাটিক কূটনৈতিক অবস্থান—যেখানে প্রতিপক্ষকে বার্তা দেওয়া হয়, কিন্তু সংঘাতকে সর্বাত্মক যুদ্ধে রূপ নেওয়া থেকে আটকানো হয়।
এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘর্ষ, সীমিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে উত্তেজনা বজায় থাকলেও সরাসরি বড় ধরনের যুদ্ধ এড়িয়ে চলেছে পক্ষগুলো।
গত বছর সংঘটিত তথাকথিত “১২ দিনের যুদ্ধ” সেই কৌশলেরই এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। ওই সংঘাতে ইরান ইসরায়েলের ওপর তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালালেও শুরুতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করেনি। এমনকি পরে কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার আগেও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এর উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—প্রতিপক্ষকে শক্তির বার্তা দেওয়া, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়িয়ে চলা।
কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই হিসাবকৃত সংযম থেকে ভিন্ন এক বাস্তবতার দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর ইরান সরাসরি মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট Donald Trump একাধিকবার কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়ার পাশাপাশি যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। তবে তেহরান এখন পর্যন্ত সেই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের শীর্ষ রাজনীতিকরা প্রকাশ্য বক্তব্যেও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। দেশটির প্রভাবশালী রাজনীতিক Ali Larijani যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির জবাবে বলেছেন, “আশুরার চেতনায় বিশ্বাসী ইরানি জাতি কোনো ফাঁপা হুমকিকে ভয় পায় না। অতীতে আরও শক্তিশালী শক্তিও ইরানকে ধ্বংস করতে পারেনি।”
একইসঙ্গে তিনি হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হয় সবার জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ হবে, না হলে তা যুদ্ধবাজদের জন্য পরাজয় ও দুর্দশার কারণ হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার Mohammad Bagher Ghalibaf আরও কড়া ভাষায় বলেন, “আমরা কোনো যুদ্ধবিরতি চাইছি না। আক্রমণকারীর মুখের ওপর এমন আঘাত হানতে হবে যাতে তারা ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার কথা চিন্তাও না করে।”
বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের এই অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরান এখন সংঘাতকে প্রতিরোধমূলক বার্তা দেওয়ার চেয়ে কৌশলগত প্রতিশোধের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাইছে।
এই প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত কতদূর গড়াবে এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ কত দ্রুত তৈরি হবে—তা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।