বঙ্গ নিউজ বিডি ডেস্ক রিপোর্ট : উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনতার স্পষ্ট রায়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স তার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন ও সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা বিশ্বরাজনীতির নজরও এখন বাংলাদেশের দিকে টেনে নিয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গত এক যুগের বেশি সময় ধরে প্রভাবশালী ছিলেন শেখ হাসিনা। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতার পালাবদলে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়। দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার বিদায় নেওয়ার পর জনমতের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন তারেক রহমান। বর্তমানে শেখ হাসিনা অবস্থান করছেন ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি-তে।
২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেপ্তার হয়ে চিকিৎসার জন্য দেশত্যাগের পর লন্ডনে অবস্থান করলেও দলীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখেছিলেন তারেক রহমান। গত বড়দিনে দেশে ফিরে তিনি যে জনসমর্থনের ঢেউ দেখেছেন, তা নিঃসন্দেহে নতুন রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। ঢাকায় তার অভ্যর্থনা ছিল নায়কোচিত—দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে তারেক রহমানের পরিচয়ও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং তার বাবা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান—যিনি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। তবে বংশানুক্রমিক রাজনীতির সমালোচনা সত্ত্বেও তারেক রহমান নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন—তার লক্ষ্য ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ এবং ‘জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা’ গড়ে তোলা।
নির্বাচনি অঙ্গীকারে তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস, দরিদ্র পরিবারে সহায়তা বৃদ্ধি, তৈরি পোশাক খাতের বাইরে খেলনা ও চামড়াশিল্পে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুইবার বা ১০ বছরে সীমিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রতিশ্রুতি একদিকে সংস্কারমুখী বার্তা দেয়, অন্যদিকে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিতও বহন করে।
অতীতের বিতর্কও তার পথচলার অংশ। দুর্নীতির অভিযোগ ও ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা মামলায় সাজা—সবই তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মামলাগুলোতে খালাস পাওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক পুনরুত্থান আরও দৃঢ় হয়েছে।
দলের অভ্যন্তরে তারেক রহমানের নিয়ন্ত্রণ ও কৌশলগত নেতৃত্ব এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি। প্রার্থী বাছাই থেকে জোট গঠন—সবখানেই তার সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল স্পষ্ট।
এখন প্রশ্ন একটাই—জনতার প্রত্যাশার ভার তিনি কতটা সফলভাবে বহন করতে পারবেন? তারেক রহমান নিজেই বলেছেন, “প্রতিশোধে কিছু আসে না, দেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা।”
রাজনীতির নতুন অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে। জনতার রায়ে যদি আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গঠন করে বিএনপি, তবে এটি হবে শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়—বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ও নতুন অধ্যায়ের সূচনা। গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও স্থিতিশীলতার যে প্রতিশ্রুতি উচ্চারিত হয়েছে, তা বাস্তবে রূপ নেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।