বিশেষ প্রতিনিধি : মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েতে বাংলাদেশি কর্মীদের কাজের ভিসা প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু করেছে প্রতিযোগিতা কমিশন। নির্ধারিত সরকারি ফি’র তুলনায় অন্তত সাত গুণ বেশি অর্থ আদায়ের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেট বছরের পর বছর ধরে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সিন্ডিকেট ভাঙতে এরই মধ্যে সরকারি পর্যায়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে।
প্রতিযোগিতা কমিশন ও রিক্রুটিং এজেন্সি সূত্রে জানা গেছে, কুয়েত ভিসা প্রসেসিং সিন্ডিকেটের প্রধান হিসেবে মর্ডান ওভারসিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সালাম আরেফকে তলব করা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্তে একটি অনুসন্ধান কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, কুয়েত বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ষষ্ঠ বৃহত্তম শ্রমবাজার এবং রেমিট্যান্সের পঞ্চম বৃহত্তম উৎস। তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ২ হাজার ৯০০ বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি থাকলেও মাত্র ১৪ থেকে ১৫টি এজেন্সি সিন্ডিকেট করে কুয়েতের ভিসা প্রসেসিং নিয়ন্ত্রণ করছে।
একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক জানান, কুয়েতের কাজের ভিসার সরকারি প্রসেসিং ফি মাত্র ৫ হাজার ৩০০ টাকা। অথচ সিন্ডিকেট নির্ধারিত অতিরিক্ত ফি’র নামে কর্মীপ্রতি ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা বেশি আদায় করা হচ্ছে। গত আট বছরে এভাবে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে তাদের দাবি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১ লাখ ৩০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী কাজের ভিসা নিয়ে কুয়েতে গেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী গৃহকর্মী। সিন্ডিকেট নির্ধারিত অতিরিক্ত ফি আদায়ের ফলে এই কর্মীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ পাওয়ার পর সরকার সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রতিযোগিতা কমিশনের পক্ষ থেকে গত ৪ জানুয়ারি আব্দুস সালাম আরেফকে নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশে বলা হয়েছে, নির্ধারিত তারিখে (৮ জানুয়ারি) হাজির হতে ব্যর্থ হলে অথবা অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র দাখিল না করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
প্রতিযোগিতা কমিশন সূত্র জানায়, এক রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে এই অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। পাশাপাশি আব্দুস সালাম আরেফের বিরুদ্ধে উড়োজাহাজের গ্রুপ টিকিট মজুদ করে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগ তদন্তে প্রতিযোগিতা কমিশনের পরিচালক মোহাম্মদ ইকতিদার আলমকে আহ্বায়ক করে একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মোহাম্মদ ইকতিদার আলম বলেন, “প্রতিযোগিতা কমিশনের বিধি অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কুয়েতের ভিসা প্রসেসিং সিন্ডিকেট সংক্রান্ত অভিযোগের প্রাথমিক অনুসন্ধান ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক জানান, অভিযুক্ত আব্দুস সালাম আরেফ একসময় ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব)-এর সভাপতি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। সেই প্রভাব খাটিয়েই তিনি কুয়েতের ভিসা প্রসেসিং সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের আগস্টে আরেফের নেতৃত্বাধীন আটাবের কমিটি বিলুপ্ত করে সরকার প্রশাসক নিয়োগ করে।