এসব এম শাহ্ জালাল সাইফুল : দেশে চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা সহজ করতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কাজ করছে—এমন আশ্বাস দিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘রেগুলেটরি চ্যালেঞ্জস ইন দ্য এলপিজি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নসহ দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সহজ করাই এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অন্যতম অগ্রাধিকার।
বিইআরসি চেয়ারম্যানের বক্তব্যে উঠে আসে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির বাস্তব চিত্র। মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ক্রেতা হিসেবে চীনের বিপুল এলপিজি সংগ্রহ বাংলাদেশের মতো ছোট আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলেছে। এর ওপর নিষেধাজ্ঞা ও কালো তালিকাভুক্তির ঝুঁকি জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে জালাল আহমেদ জানান, ২০২৪ সালে এলপিজি আমদানি বেড়ে ১৬ দশমিক ১ লাখ টনে পৌঁছালেও ২০২৫ সালে তা কমে ১৪ দশমিক ৬৫ লাখ টনে নেমেছে। পুরো এলপিজি খাতটি যেহেতু বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত, তাই ভোক্তাদের ভোগান্তি কমাতে নীতিগত সহায়তা ও নিয়ন্ত্রক স্থিতিশীলতা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও আইইউবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ম. তামিম নিয়ন্ত্রক ব্যয়ের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শুধুমাত্র লাইসেন্স নবায়নেই কোম্পানিগুলোকে বছরে এক কোটির বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ভোক্তার কাঁধে। অথচ গ্যাস সংকট ও শক্তি রূপান্তরের বাস্তবতায় এলপিজির গুরুত্ব বাড়ছে এবং এই খাতে ইতোমধ্যে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হয়েছে।
ভোক্তা অধিকার প্রসঙ্গে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ. এইচ. এম. সফিকুজ্জামান এলপিজির মতো নিত্যপণ্যে আমদানি শুল্ক না রাখার দাবি জানান। লোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক মহেশখালীতে সমন্বিত খালাস সুবিধার জন্য ২০০ একর জমি বরাদ্দ এবং ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর প্রস্তাব দেন।
আলোচনায় উঠে আসে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার খরচ কমানো গেলে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১০০ টাকা পর্যন্ত কমানো সম্ভব। বর্তমানে দেশে প্রায় ৬০ লাখ পরিবার এলপিজির ওপর নির্ভরশীল—এ বাস্তবতায় নীতি সংস্কার আর প্রশাসনিক সরলীকরণ কেবল শিল্পের দাবি নয়, বরং জনস্বার্থের প্রশ্ন।
গোলটেবিলের শেষভাগে বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ভবিষ্যতে সরকার পরিচালনার সুযোগ পেলে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে জ্বালানি খাতকে আরও আধুনিক ও জনবান্ধব করা হবে।
সব মিলিয়ে আলোচনায় স্পষ্ট—এলপিজি খাতে সংকট শুধু বৈশ্বিক নয়, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রক জটিলতাও বড় বাধা। সময়োপযোগী সংস্কার, শুল্ক-ব্যয় হ্রাস এবং সমন্বিত অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলেই ভোক্তা পর্যায়ে স্বস্তি ফিরবে—এটাই ছিল গোলটেবিলের মূল সুর।