নিজস্ব প্রতিবেদক : নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতির উদ্দেশে দেওয়া তাঁর প্রথম ভাষণে যে বার্তা দিয়েছেন, তা নিছক আনুষ্ঠানিক ভাষণ নয়— এটি একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ঘোষণা। বুধবার রাতে সম্প্রচারিত এই ভাষণ সরাসরি প্রচার করে বাংলাদেশ টেলিভিশন, আর এর মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “দলমত, ধর্ম, দর্শন যার যার— রাষ্ট্র সবার।” এই একটি বাক্যই বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিভাজন ও প্রতিহিংসার পর দেশবাসী এখন চায় অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রচিন্তা। যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন, যারা দেননি কিংবা ভোট প্রক্রিয়া থেকে দূরে ছিলেন— সবার অধিকার সমান বলে তিনি যে স্বীকৃতি দিয়েছেন, তা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত।
তবে ভাষণের শক্তি কেবল বক্তব্যে নয়, বাস্তব প্রয়োগে। প্রধানমন্ত্রী আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছেন— দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন, বিধিবদ্ধ নীতিমালার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং জবরদস্তির রাজনীতি পরিহারের ঘোষণা দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন, প্রশাসনিক সংস্কার কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে দৃশ্যমান হবে।
নতুন সরকার যে প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নিয়েছে, সেটিও তিনি এড়িয়ে যাননি। ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসন কাঠামো এবং অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। দুর্নীতি ও জুয়া-মাদকের বিস্তার রোধে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু কেবল অভিযান নয়— টেকসই সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিই হবে সফলতার মাপকাঠি।
রমজানকে কেন্দ্র করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের আহ্বান বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যবসায়ীদের প্রতি অতিমুনাফা পরিহারের অনুরোধ এবং বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরামর্শ গ্রহণের ঘোষণা একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দেয়। তবে বাজার সিন্ডিকেট ভাঙার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই দেখার বিষয়।
প্রধানমন্ত্রীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা— কৃচ্ছতা সাধন। এমপিদের ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি বা প্লট সুবিধা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন বার্তা দিতে পারে, যদি তা ধারাবাহিকতা পায়। শাসকের সংযমই জনগণের আস্থার ভিত্তি গড়ে তোলে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার পুনর্গঠন, রেল ও সড়ক সমন্বয়, তরুণদের দক্ষ জনসম্পদে রূপান্তর— এসব পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির জন্য জরুরি। তবে পরিকল্পনার ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নের গতি ও স্বচ্ছতাই নির্ধারণ করবে সরকারের সাফল্য।
নবগঠিত সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ যেমন বড়, প্রত্যাশাও তেমনি আকাশছোঁয়া। প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী যে অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও কৃচ্ছতানির্ভর রাষ্ট্রচিন্তার কথা বলেছেন— তা বাস্তবায়িত হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
রাষ্ট্র সবার— এই অঙ্গীকার এখন পরীক্ষার মুখে। ইতিহাস অপেক্ষা করছে, কথার সঙ্গে কাজের মিল কতটা হয়।