নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজনৈতিক মাঠে আবেগ একটি শক্তিশালী হাতিয়ার—কিন্তু সেই আবেগ যদি ভুয়া পরিচয় আর বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের ওপর দাঁড়ায়, তাহলে তা শুধু অনৈতিকই নয়, জনআস্থার জন্যও বিপজ্জনক। রাজধানীর বাড্ডায় জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ১১-দলীয় নির্বাচনি জোটের এক সমাবেশে শহীদ ওসমান হাদির বোন পরিচয়ে এক নারীর বক্তব্যকে ঘিরে যে রহস্য ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা রাজনীতির এই অস্বস্তিকর বাস্তবতাকেই সামনে আনছে।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত ওই সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের উপস্থিতিতে শবনম খাদিজা নামের এক নারী নিজেকে শহীদ ওসমান হাদির বোন হিসেবে পরিচয় দিয়ে জোটপ্রার্থী নাহিদ ইসলামের পক্ষে আবেগঘন বক্তব্য দেন। বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বিষয়টি ভিন্ন মোড় নেয়।
শহীদ ওসমান হাদির স্ত্রী রাবেয়া ইসলাম শম্পা ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে ওই নারীকে সরাসরি ‘ভুয়া’ আখ্যা দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শহীদ ওসমান হাদি জীবদ্দশায় কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না এবং তার নাম কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করার অনুরোধ জানান। একইসঙ্গে তিনি এটাও উল্লেখ করেন—ব্যক্তিগতভাবে কেউ তার আদর্শ ধারণ করলে তাতে পরিবারের আপত্তি নেই, কিন্তু পরিচয় জাল করে রাজনৈতিক বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়।
এই প্রতিবাদ আরও জোরালো হয় যখন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের শম্পার পোস্ট শেয়ার করে জানান, পরিবারের তথ্যমতে বক্তব্য দেওয়া নারী হাদির তিন বোনের কেউ নন। এখান থেকেই প্রশ্নগুলো আরও ঘনীভূত হয়।
কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে কীভাবে একজন অজ্ঞাত পরিচয়ের নারী মঞ্চে উঠে শহীদের বোন পরিচয়ে বক্তব্য দিলেন? কে তাকে সেই পরিচয়ে উপস্থাপন করলেন? এটি কি অবহেলা, না কি পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এ ধরনের ঘটনার দায় কে নেবে?
এত প্রশ্নের মাঝেও জামায়াতে ইসলামী কিংবা ১১-দলীয় জোটের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না আসা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা নয়; বরং সন্দেহকে আরও পোক্ত করছে। শহীদের নাম, আত্মত্যাগ এবং পরিবারের আবেগ—সবকিছু মিলিয়ে এটি নিছক একটি ‘ভুল পরিচয়’ নয়, বরং রাজনৈতিক নৈতিকতার একটি বড় পরীক্ষা।
গণতন্ত্রে রাজনীতি হবে মতাদর্শের, কর্মসূচির ও জনস্বার্থের। ভুয়া পরিচয় আর আবেগী মঞ্চনাটক দিয়ে ভোট আদায়ের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত রাজনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। শহীদ ওসমান হাদির নাম ব্যবহারের এই ঘটনায় জোটের পক্ষ থেকে দ্রুত, স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা এখন সময়ের দাবি—না হলে এই নীরবতাই হয়ে উঠবে সবচেয়ে জোরালো রাজনৈতিক ভাষ্য।