এস এম শাহ্ জালাল সাইফুল : বাংলাদেশের কৃষিখাতকে জাতীয় সমৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তিতে রূপান্তর এবং কৃষকের জীবনমান টেকসইভাবে উন্নয়নের লক্ষ্যে একগুচ্ছ যুগোপযোগী প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার কার্ড’ প্রবর্তন, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ, ক্ষুদ্রঋণের এক বছরের কিস্তি সরকার কর্তৃক পরিশোধসহ কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও নিরাপদ খাদ্য খাতে ব্যাপক সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নির্বাচনী ইশতেহার উপস্থাপন করেন।
ইশতেহারে বলা হয়, কৃষি বাংলাদেশের জীবনরেখা। কিন্তু স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহারের কারণে কৃষিখাত তার পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বিএনপি একটি আত্মনির্ভর, জলবায়ু-সহিষ্ণু, প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃষক-কেন্দ্রিক আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে।
ইশতেহারের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হিসেবে ‘কৃষক কার্ড’ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষক ন্যায্যমূল্যে সার, বীজ, কীটনাশক, ভর্তুকি, প্রণোদনা, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ, কৃষি বিমা, সেচ সুবিধা এবং ডিজিটালভাবে আবহাওয়া ও বাজার তথ্য পাবেন। মৎস্যচাষি, প্রাণিসম্পদ খামারি ও কৃষিখাতসংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এ সুবিধার আওতায় থাকবেন।
ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয় ও বাজার বৈষম্যের বাস্তবতায় কৃষকদের স্বস্তি দিতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় নিবন্ধিত এনজিও থেকে নেওয়া ক্ষুদ্রঋণের এক বছরের কিস্তি সরকার পরিশোধ করবে বলে জানানো হয়।
কৃষি উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য আনতে ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি ক্রয় কেন্দ্র স্থাপন, দেশব্যাপী কোল্ড স্টোরেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং কৃষিজমির অকৃষি ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে। বরেন্দ্র প্রকল্প পুনরায় চালু, খাল খনন ও আম সংরক্ষণের জন্য বিশেষ হিমাগার স্থাপনের পরিকল্পনাও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকের ঝুঁকি কমাতে শস্য, পশু, মৎস্য ও পোলট্রি বিমা চালুর অঙ্গীকার করা হয়েছে। একই সঙ্গে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’ পুনঃবাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন ও পুনরুদ্ধারের ঘোষণা দেওয়া হয়।
উত্তরাঞ্চলে বিশেষায়িত কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল গঠন, তরুণদের জন্য কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপ প্রকল্প, অঞ্চলভিত্তিক ফসল উৎপাদন, প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন ও বায়োটেকনোলজি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সংযুক্ত করার কথাও ইশতেহারে তুলে ধরা হয়।
মৎস্যখাতে ‘জাল যার জলা তার’ নীতি বাস্তবায়ন, জলমহাল ও হাওরের ইজারা প্রথা বিলুপ্ত, নিষিদ্ধ মৌসুমে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান এবং চিংড়িকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে রূপান্তরের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রাণিসম্পদ খাতে নিরাপদ ফিড, ভ্যাকসিন প্ল্যান্ট স্থাপন এবং নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের বিশেষ সহায়তার কথাও উল্লেখ করা হয়।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে ভেজালবিরোধী কঠোর আইন প্রয়োগ, খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল রোধে মনিটরিং জোরদার, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও বিএসটিআইকে শক্তিশালী করা এবং একটি পৃথক ‘খাদ্য ও ঔষধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
ইশতেহারে বিএনপি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করে, কৃষককে ক্ষমতায়িত উদ্যোক্তায় রূপান্তর এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করেই বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব।