নিজস্ব প্রতিবেদক : জাইমা রহমানকে ঘিরে বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা জোরালো হচ্ছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান আনুষ্ঠানিক কোনো পদে না থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তার উপস্থিতি ও কর্মকাণ্ড বিএনপির ভেতরে-বাইরে বিশেষ মনোযোগ কেড়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাইমা রহমানকে ধীরে ধীরে জনপরিসরে তুলে আনার মাধ্যমে বিএনপি নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব প্রস্তুতি এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিতে চাইছে। বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করাই এই কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে করছেন অনেকে।
দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে অবস্থানের পর গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান পরিবারসহ। এরপর থেকেই জাইমা রহমানকে ঘিরে দলীয় অন্দরমহল ও সাধারণ মানুষের আগ্রহ লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। যদিও তিনি সরাসরি নির্বাচনী প্রচারে নামেননি, তবে যেসব অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন, সেগুলো বিএনপির ভেরিফায়েড প্ল্যাটফর্মগুলোতে গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে প্রতীকী সংযোগ তৈরি করতেই জাইমা রহমানকে সামনে আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে ধর্মীয় কট্টর রাজনীতির বিপরীতে নারী নেতৃত্ব ও আধুনিক রাজনৈতিক ভাবনার একটি বিকল্প উপস্থাপনের চেষ্টাও এতে রয়েছে।
জাইমা রহমান প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নাতনি। ১৯৯৫ সালের অক্টোবরে ঢাকায় জন্ম নেওয়া জাইমা রহমানের শিক্ষা জীবন শুরু হয় ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। পরবর্তীতে তিনি লন্ডনে ম্যারি মাউন্ট গার্লস স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং কুইন ম্যারি ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। যুক্তরাজ্যের ইনার টেম্পল থেকে তিনি বার-অ্যাট-ল ডিগ্রি অর্জন করেন।
গত বছরের ২৪ নভেম্বর খোলা তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি নিজেকে পরিচয় দেন—‘ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল, কমিউনিকেশনস স্ট্র্যাটেজিস্ট ও কর্পোরেট লইয়ার’ হিসেবে। ২৩ ডিসেম্বর দেওয়া এক লেখায় তিনি জানান, আইন পেশায় কাজ করতে গিয়ে মানুষের জীবনের বাস্তব গল্প তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
দলীয় কর্মকাণ্ডে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা এখনো সীমিত হলেও, গত নভেম্বরে প্রবাসীদের নিয়ে বিএনপির একটি ভার্চুয়াল সভায় অংশগ্রহণ এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্টে তারেক রহমানের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিতি তাকে আলোচনায় আনে।
দেশে ফেরার পর ১৮ জানুয়ারি ‘উইমেন শেপিং দ্য নেশন’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো বক্তব্য দেন তিনি। এছাড়া ২৫ জানুয়ারি বিএনপি আয়োজিত ‘আমার ভাবনায় বাংলাদেশ’ রিল প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের সঙ্গে আয়োজিত বৈঠকেও অংশ নেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, উপমহাদেশের রাজনীতিতে পারিবারিক নেতৃত্ব নতুন কিছু নয়, আর বিএনপির রাজনীতিও দীর্ঘদিন ধরেই পরিবারকেন্দ্রিক। তার ভাষায়, জাইমা রহমানকে যেভাবে সামনে আনা হচ্ছে, তাতে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রস্তুতির বিষয়টি স্পষ্ট।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তরুণ, নারী ও জেন-জি ভোটারদের আকৃষ্ট করতেই বিএনপি সচেতনভাবে জাইমা রহমানকে সামনে আনছে।
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন একটাই—জাইমা রহমান কি ভবিষ্যতে বিএনপির নেতৃত্বে সক্রিয় ভূমিকায় আসবেন, নাকি এই উপস্থিতি কেবলই নির্বাচনী কৌশলের অংশ? সে উত্তর দেবে সময়ই।