এসব এম শাহ্ জালাল সাইফুল : সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত নাগরিক শোকসভা ক্রমেই রূপ নেয় এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক উচ্চারণে। এটি ছিল শুধু শোক প্রকাশের আয়োজন নয়, বরং রাষ্ট্রের দায়িত্বহীনতা, বিচারব্যবস্থার বিতর্কিত ভূমিকা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দীর্ঘ অধ্যায়ের বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত নাগরিক প্রতিবাদ।
শোকসভায় উপস্থিত বিশিষ্ট নাগরিকদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—বেগম খালেদা জিয়া কেবল বিএনপির চেয়ারপারসন বা তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের এক অনিবার্য রাজনৈতিক অধ্যায়। দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি যে জাতীয় নেত্রীতে পরিণত হয়েছিলেন, তার প্রমাণ মিলেছে তার জানাজায় লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে।
বক্তারা বলেন, জাতির এই সন্ধিক্ষণে বেগম খালেদা জিয়ার মতো অভিজ্ঞ, সংযত ও রাষ্ট্রচিন্তায় গভীর একজন নেত্রীর প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশি। অথচ রাষ্ট্র শুধু তাকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করেনি, বরং শেষ জীবনেও তাকে ন্যূনতম মানবিক ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে—এ অভিযোগ এসেছে চিকিৎসক, আইনবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে।
বিশেষ করে তার চিকিৎসায় অবহেলার বিষয়টি শোকসভায় এক গুরুতর রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে উঠে আসে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বেগম খালেদা জিয়ার জটিল রোগ থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা প্রটোকল অনুসরণ করা হয়নি। লিভার সিরোসিসের মতো মারাত্মক অবস্থার মধ্যেও নিয়মিত লিভার ফাংশন টেস্ট না করা, গুরুত্বপূর্ণ আল্ট্রাসনোগ্রাফি না করানো এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্ত না করার সিদ্ধান্তকে বক্তারা ‘ইচ্ছাকৃত অবহেলা’ হিসেবে আখ্যা দেন। এই অবহেলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল কিনা—তা তদন্তের মাধ্যমে জাতির সামনে উন্মোচনের দাবি ওঠে জোরালোভাবে।
আইনবিদদের বক্তব্যে উঠে আসে আরও ভয়াবহ চিত্র। বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পরিচালিত মামলাগুলোকে তারা ‘বিচারের নামে নিষ্ঠুরতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। আদালতে তার একটি সাধারণ বিস্ময়সূচক মন্তব্যকে স্বীকারোক্তি হিসেবে লিপিবদ্ধ করার ঘটনা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক দৃষ্টান্ত বলে অভিহিত করা হয়। বক্তারা বলেন, এই বিচার শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, গোটা রাষ্ট্রকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
শোকসভায় বারবার উচ্চারিত হয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উদারতা ও প্রতিশোধহীনতার দর্শন। দীর্ঘ কারাবাস, গৃহবন্দিত্ব ও পারিবারিক ক্ষতির পরও তিনি কখনো প্রতিহিংসার রাজনীতি করেননি। বরং তার শেষ প্রকাশ্য বক্তব্যেও তিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন—ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার। বক্তাদের মতে, এই দর্শন আজকের বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক বার্তা।
সভায় তারেক রহমানের নেতৃত্ব প্রসঙ্গও উঠে আসে গুরুত্বের সঙ্গে। বক্তারা বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করা গর্বের পাশাপাশি এক বিশাল ঐতিহাসিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব কেবল একটি দলের নয়, বরং গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সব মানুষের সম্মিলিত দায়।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দাবি হিসেবে উঠে আসে—বেগম খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত করা। বক্তারা বলেন, রাষ্ট্র যদি সত্যিই ইতিহাসের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করতে চায়, তবে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ ইতিহাস ইতোমধ্যেই তাকে তার স্থান দিয়েছে—রাষ্ট্র চাইলে শুধু সেই সত্যকে স্বীকৃতি দিতে পারে।
শোকসভা শেষ হলেও যে প্রশ্নগুলো উঠে এসেছে, সেগুলো এখনো অনুত্তরিত। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিকতা, বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর এক গভীর ছায়া ফেলেছে। ইতিহাসের কাঠগড়ায় এখন রাষ্ট্রই দাঁড়িয়ে। প্রশ্ন একটাই—এই দায় কি রাষ্ট্র স্বীকার করবে, নাকি নীরবতাই হয়ে উঠবে তার একমাত্র জবাব?