পোস্টাল ব্যালটে অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন প্রক্রিয়া, ইসির ব্যাখ্যা দাবি বিএনপির
এস এম শাহ্ জালাল সাইফুল : জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগে চালু হওয়া পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাকে ঘিরে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসায় নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই অনিয়মের পেছনে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির পক্ষে প্রশাসনিক তৎপরতার ইঙ্গিত রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সচিবের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ।
বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে আরও উপস্থিত ছিলেন দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, নির্বাচন কমিশনের সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ জকরিয়া এবং বিএনপির আইন সহায়তা উপকমিটির প্রধান ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগে এটি বাংলাদেশের প্রথম উদ্যোগ হওয়ায় কিছু প্রক্রিয়াগত ত্রুটি থাকতে পারে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু যেসব অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসছে, তা কেবল ভুলভ্রান্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো বাসা থেকে একসঙ্গে ২০০ থেকে ৩০০টি পোস্টাল ব্যালট পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও ব্যালট জব্দের ঘটনা ঘটছে, আবার কোথাও ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে গেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এমনকি একজন ভোটারের নামে পাঠানো ব্যালট অন্য ব্যক্তি গ্রহণ করার ঘটনাও সামনে এসেছে, যা সরাসরি আইন ও নৈতিকতার লঙ্ঘন।
বিএনপির এই নেতা বলেন, কোন প্রক্রিয়ায় প্রবাসীদের কাছে ব্যালট পাঠানো হয়েছে, তারা কীভাবে ভোট দেবেন, কোথায় স্ক্যান বা জমা দেবেন—এবং এক জায়গায় বিপুলসংখ্যক ব্যালট পাওয়া গেলে তার দায় কার—এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট ও প্রকাশ্য ব্যাখ্যা জরুরি। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বিষয়গুলো তারা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা দেবে।
আচরণবিধি প্রসঙ্গেও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ভোটার অংশগ্রহণ বাড়াতে ভোটার স্লিপে ভোটারের নম্বরের পাশাপাশি প্রার্থীর নাম ও প্রতীক থাকা প্রয়োজন। বর্তমান আচরণবিধিতে ভোটার স্লিপে দলের নাম বা প্রার্থীর ছবি না দেওয়ার যে বিধান রয়েছে, তা বাস্তবতা বিবেচনায় পুনর্বিবেচনা করা দরকার। নির্বাচন কমিশন চাইলে নিজ ক্ষমতাবলেই এই বিধান সংশোধন করতে পারে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ভোটার স্লিপ দেওয়া মানেই ভোটে প্রভাব বিস্তার নয়। ভোটার নিজ বিবেচনায় তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবে। নির্বাচনকে অকারণে কঠিন না করে ভোটারবান্ধব করা জরুরি।
এ সময় তিনি অতীতের একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একটি সফর স্থগিত করা হয়েছিল, যদিও সেটি রাজনৈতিক প্রচার ছিল না। অথচ বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও নির্বাচন কমিশনের নীরবতা বিএনপির দৃষ্টিতে এসেছে, যা প্রশ্নবিদ্ধ।
পোস্টাল ব্যালটের কাঠামো নিয়েও প্রস্তাব দেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় যেসব প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাদের নাম ও প্রতীকসহ যে সাধারণ ব্যালট ব্যবহার করা হয়, সেই একই ব্যালট সংশ্লিষ্ট এলাকার পোস্টাল ব্যালট হিসেবেও ব্যবহার করা উচিত। এতে আলাদা করে প্রতীকসংবলিত বহু ব্যালট ছাপানোর প্রয়োজন পড়বে না এবং জটিলতাও কমবে।
নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে ইতিবাচকভাবে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে বলে জানান বিএনপির এই শীর্ষ নেতা।
সব মিলিয়ে, পোস্টাল ব্যালটকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগ শুধু একটি প্রক্রিয়াগত বিতর্ক নয়—বরং এটি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও গণতান্ত্রিক বৈধতার প্রশ্নকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। এখন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব, দ্রুত, স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপের মাধ্যমে এই আস্থার সংকট নিরসন।