নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবন কেবল ক্ষমতার বৃত্তে আবদ্ধ নয়—তাঁরা হয়ে ওঠেন প্রতিরোধের ভাষা, আত্মমর্যাদার প্রতীক। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন ঠিক তেমনই একজন মানুষ।
১৯৮৮-৮৯ সালের সেই সময়, যখন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল ধানমন্ডিতে, তখনই তাঁর সঙ্গে একজন তরুণ, আগ্রাসী ও প্রশ্নবিদ্ধ সাংবাদিকের প্রথম মুখোমুখি সাক্ষাৎ। লিখিত প্রশ্নের গণ্ডি ভেঙে মুখোমুখি প্রশ্ন করার যে সাহস তিনি সেদিন অনুমতি দিয়েছিলেন, সেটাই বলে দেয়—তিনি প্রশ্নকে ভয় পেতেন না, বরং প্রশ্নের মধ্যেই গণতন্ত্র খুঁজতেন।
একটি চোখা প্রশ্নে যখন কক্ষে অস্বস্তি নেমে আসে, তখন দলের শীর্ষ নেতার আপত্তিকে যিনি নিজেই থামিয়ে দেন, তিনি কোনো সাধারণ রাজনীতিক নন। তিনি নেতা—যিনি জানতেন, সাংবাদিকের প্রশ্ন থামানো মানেই সত্যকে আটকানো। হাসিমুখে কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সেদিন তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, নেতৃত্ব মানে কর্তৃত্ব নয়, নেতৃত্ব মানে আত্মবিশ্বাস।
পরবর্তী সময়েও বারবার তাঁর একান্ত সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ মিলেছে। কিন্তু প্রকৃত পরিচয়টি স্পষ্ট হয়েছে আরও পরে—২০০৯ সালের পর। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে যখন পরিকল্পিতভাবে তাঁকে মিথ্যা মামলা, অপবাদ, হয়রানি ও নির্যাতনের বেড়াজালে বন্দি করতে চেয়েছে, তখনও তিনি নত হননি। অসুস্থ শরীর, বন্দি জীবন, রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতা—কিছুই তাঁর অবস্থান টলাতে পারেনি।
এই দীর্ঘ পনের বছরে বিএনপির ভেতর থেকেই যখন অনেকের কণ্ঠ নীরব, তখন হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া আর কাউকে দেশনেত্রীর পক্ষে দৃঢ়ভাবে কথা বলতে শোনা যায়নি। সেই সময় একজন কলামিস্ট ও টকশো বক্তা হিসেবে প্রকাশ্যে, নির্ভয়ে তাঁর পাশে দাঁড়ানো ছিল ঝুঁকিপূর্ণ—তবু নৈতিক দায়িত্ব থেকে সরে আসা হয়নি।
সময় সাক্ষ্য দেয়। ইতিহাসও।
আল্লাহ তাঁর প্রতিদান দিয়েছেন।
শেষ বিদায়ের দিনে, যখন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো বেগম খালেদা জিয়া শুয়ে আছেন—সেই মুহূর্তে তাঁর পরিবার ও তাঁর কাছাকাছি থাকার সৌভাগ্য খুব কম মানুষের ভাগ্যে জোটে। প্রথম দোয়ায় শরিক হওয়া, সেই পতাকা তাঁর সন্তানের হাতে তুলে দেওয়ার মুহূর্ত—এসব কোনো ব্যক্তিগত গর্ব নয়, বরং একটি জীবনের নৈতিক হিসাব।
যে জাতীয় পতাকা সমুন্নত রাখতে তিনি সারাজীবন বঞ্চনা, নিপীড়ন আর দুঃখ-কষ্ট বয়ে বেড়িয়েছেন—সেই পতাকা দিয়েই তাঁকে শেষ বিদায় জানানো হয়েছে। ইতিহাস এখানেই কথা বলে।
আজ রাজনীতির কোলাহলে অনেক কিছু হারিয়ে যায়। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার জীবন মনে করিয়ে দেয়—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, আপস সহজ, কিন্তু মর্যাদা চিরস্থায়ী।
আল্লাহর কাছে হাজারো শুকরিয়া—
এই ইতিহাসের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী হওয়ার জন্য।