বঙ্গ নিউজ বিডি প্রতিবেদক : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কুমিল্লার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসনে মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ে বড় ধরনের ছাঁটাই হয়েছে। তথ্য গোপন, আইনগত ত্রুটি ও ভোটার সমর্থনের শর্ত পূরণে ব্যর্থতার অভিযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রার্থীসহ মোট ১১ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছেন কুমিল্লা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মু. রেজা হাসান। এ সিদ্ধান্তে নির্বাচনী মাঠে রাজনৈতিক সমীকরণে স্পষ্ট প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুক্রবার (২ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টায় প্রার্থীদের উপস্থিতিতে কুমিল্লা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শুরু হয়। প্রথম দিনে কুমিল্লার ১১টি আসনের মধ্যে ১ থেকে ৬ নম্বর আসনের মনোনয়নপত্র যাচাই করা হয়। বাকি পাঁচটি আসনের যাচাই-বাছাই শনিবার অনুষ্ঠিত হবে।
যাচাই-বাছাই শেষে কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি-মেঘনা), কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) ও কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর)—এই তিনটি আসনে মোট ৩১ জন প্রার্থীর মধ্যে ২০ জনের মনোনয়ন বৈধ ও ১১ জনের মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করা হয়।
কুমিল্লা-১: বিএনপির আধিপত্য অটুট, বাতিল ৫
কুমিল্লা-১ আসনে জমা পড়া ১২টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে পাঁচটি বাতিল করা হয়। নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে গুরুতর অসামঞ্জস্য পাওয়ায় এসব মনোনয়ন বাতিল হয় বলে রিটার্নিং অফিস সূত্রে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের শীর্ষ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও তার ছেলে ড. খন্দকার মারুফ হোসেনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি ও প্রভাবকে আবারও স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে জামায়াত প্রার্থী মনিরুজ্জামান বাহলুলসহ মোট সাতজন প্রার্থী বৈধতা পান।
মনোনয়ন যাচাই শেষে ড. খন্দকার মারুফ হোসেন বলেন,
“কুমিল্লা-১ আসনে বিএনপি পূর্ণ প্রস্তুত। দল আমাকে ও আমার বাবাকে মনোনয়ন দিয়েছে। প্রত্যাহারের শেষদিনের আগেই দল কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেবে।”
তার বক্তব্যে এই আসনে বিএনপির নিয়ন্ত্রণ ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত স্পষ্ট।
জামায়াত প্রার্থী মনিরুজ্জামান বাহলুল বলেন,
“এখন পর্যন্ত ভোটের পরিবেশ অনুকূল। আমরা আশা করছি, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় জনগণ জামায়াতের পক্ষেই রায় দেবে।”
তবে তার বক্তব্যকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা আত্মরক্ষামূলক হিসেবেই দেখছেন।
কুমিল্লা-২: বিএনপি শক্ত অবস্থানে
কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনে জমা দেওয়া ১০টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে চারটি বাতিল করা হয়। বিএনপি মনোনীত কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া এবং দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক এপিএস আব্দুল মতিনসহ ছয়জন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে এই আসনেও বিএনপির সাংগঠনিক প্রাধান্য স্পষ্ট হয়েছে।
কুমিল্লা-৩: জামায়াত ও গণ-অধিকার পরিষদের ধাক্কা
কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসনে নয়জন প্রার্থীর মধ্যে দুইজনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়। বাতিল হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ইউসুফ হাকিম সোহেল এবং গণ-অধিকার পরিষদের মনিরুজ্জামান।
এই আসনে বিএনপি নেতা মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদসহ রাজনৈতিক ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে সাতজন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার মাধ্যমে বিএনপির অবস্থান আরও শক্ত হলো।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কড়া বার্তা
কুমিল্লা জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মু. রেজা হাসান বলেন,
“আজ কুমিল্লা-১ থেকে কুমিল্লা-৬ আসনে মোট ৬২ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র যাচাই করা হচ্ছে। আইন ও বিধি অনুযায়ী যাদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে তারা আপিলের সুযোগ পাবেন। তবে বিধি-বহির্ভূত কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”
মনোনয়ন যাচাইয়ের এই সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে— নির্বাচনী মাঠে টিকে থাকতে হলে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, আইনগত ও সাংগঠনিক প্রস্তুতিও অপরিহার্য। কুমিল্লার এই তিন আসনে মনোনয়ন বাতিলের ঘটনা আগামী দিনে নির্বাচনী রাজনীতিতে আরও উত্তাপ ছড়াবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।