এস এমন শাহ্ জালাল সাইফুল : রাজনীতির ইতিহাসে যেখানে আলো পড়ে নেতা, আন্দোলন ও ক্ষমতার ওপর—সেখানে নীরবে থেকে যাঁরা ইতিহাসের সাক্ষী হন, তাঁদের নাম খুব কমই উচ্চারিত হয়। বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে এমনই এক ছায়াসঙ্গীর নাম ফাতেমা বেগম। সেই ফাতেমাকেই চিরবিদায় জানালেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে গৃহকর্মীর পরিচয় পেরিয়ে ফাতেমা হয়ে উঠেছিলেন খালেদা জিয়ার একান্ত সঙ্গী ও নির্ভরতার মানুষ। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে শুরু করে গৃহবন্দিত্বের দীর্ঘ দিন, হাসপাতালের নিঃসঙ্গ রাত কিংবা বিদেশের চিকিৎসা সফর—সবখানেই নিঃশব্দে পাশে ছিলেন তিনি।
সর্বশেষ এভারকেয়ার হাসপাতালে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন ফাতেমা। অসুস্থ শরীর, একাকীত্ব আর রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে তিনি ছিলেন অবিচল এক মানবিক ছায়া।
এক সময় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘কারাগারেও তাকে (খালেদা জিয়া) ফাতেমাকে লাগবে।’ রাজনৈতিক বিদ্রুপের সেই মন্তব্য আজ বাস্তবতার কঠিন সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে—কারাগারেও, হাসপাতালেও, ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও ফাতেমা ছিলেন অবিচ্ছেদ্য।
দুঃখের ভেতর বড় হওয়া জীবন
ভোলার সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের শাহ-মাদার গ্রামে জন্ম ফাতেমা বেগমের। দরিদ্র পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে অল্প বয়সেই সংসারের ভার আসে কাঁধে। স্বামী হারুন লাহাড়ির অকাল মৃত্যুতে দুই শিশুসন্তান নিয়ে ভেঙে পড়ে তার জীবন। ২০০৯ সালে সন্তানদের গ্রামে রেখে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় আসেন তিনি।
সেই বছরই পূর্বপরিচয়ের সূত্রে কাজ পান খালেদা জিয়ার বাসভবনে। সেখান থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ সহযাত্রা—যা শুধু কাজের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
ফিরোজা থেকে কারাগার
২০১৪ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিতে গুলশানের ফিরোজার সামনে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে অসুস্থ শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন খালেদা জিয়া। তখন নীরবে তার হাত শক্ত করে ধরে ছিলেন ফাতেমা। সেই দৃশ্য ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা পড়ে—রাজনৈতিক উত্তাপের মাঝেও মানবিকতার এক স্থির ছবি।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে আদালতের অনুমতিতে গৃহকর্মী হিসেবে ফাতেমা প্রবেশ করেন নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো জেলখানায়। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই স্বেচ্ছায় তিনি হয়ে ওঠেন কারাবন্দি—কারণ তিনি জানতেন, এই সময়ে একা থাকা মানেই ভেঙে পড়া।
করোনা, হাসপাতাল আর শেষ অধ্যায়
২০২১ সালে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৫৩ দিন হাসপাতালে ছিলেন খালেদা জিয়া। যখন প্রিয়জনের কাছেও যেতে মানুষ ভয় পাচ্ছিল, তখন ফাতেমা ছিলেন সেবিকা, সাহস ও ভরসা হয়ে।
পরবর্তীতে লন্ডনে উন্নত চিকিৎসার সময়ও ছায়ার মতো সঙ্গে ছিলেন তিনি। কোনো আলোচনায় নেই তার নাম, নেই কোনো বক্তব্য। তবু ইতিহাসের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে তার উপস্থিতি ছিল স্পষ্ট।
ফাতেমা বেগম প্রমাণ করে গেছেন—সব সম্পর্ক ক্ষমতার নয়, কিছু সম্পর্ক শুধু দায়িত্ব, মমতা আর মানবিকতার। রাজনীতির কোলাহলের ভিড়ে তিনি ছিলেন এক নীরব নাম, আর সেই নীরবতাই তাকে ইতিহাসের এক আলাদা অধ্যায়ে স্থান করে দিয়েছে।