নিজস্ব প্রতিবেদক : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন—কে বসছেন স্পিকারের আসনে? আগামী ১২ মার্চ শুরু হতে যাওয়া অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও প্রশাসনিক সূত্রে জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে একটি নাম—ড. আবদুল মঈন খান।
দলীয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, স্পিকার পদে ড. মঈন খানের সম্ভাবনাই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, বিভাগে তার নাম নিয়ে আলোচনা চলছে এবং অনেকটা নিশ্চিতভাবেই তিনি পরবর্তী স্পিকার হতে পারেন—এমন ধারণা কর্মকর্তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও ‘ক্লিন ইমেজ’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান নরসিংদী-২ আসন থেকে পাঁচবারের নির্বাচিত সংসদ-সদস্য। প্রবীণ, অভিজ্ঞ এবং তুলনামূলকভাবে ‘ক্লিন ইমেজ’–এর নেতা হিসেবে দল ও সাধারণ মানুষের একাংশের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক; সাংবিধানিক ও সংসদীয় প্রক্রিয়া সম্পর্কে তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্পিকার পদের জন্য তাকে শক্ত প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে—এমনটাই বলছেন দলীয় নেতারা।
ড. মঈন খান নিজেও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ১৯৯১ সালে তিনি সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে একদিনের জন্য স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যা সে সময় প্রশংসিত হয়েছিল। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন—দল যে দায়িত্ব দেবে, সেটিই তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবেন।
কেন গুরুত্ব পাচ্ছে মঈন খানের নাম?
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি। নতুন মন্ত্রিসভায় ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী স্থান পেয়েছেন; পাশাপাশি উপদেষ্টা হিসেবেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১০ জনকে। কিন্তু দলের স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্য সরকারে অন্তর্ভুক্ত হলেও ড. মঈন খান এখনো মন্ত্রিসভার বাইরে আছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাকে সাংবিধানিক পদে বসানোর মধ্য দিয়ে দল একটি ভারসাম্যপূর্ণ বার্তা দিতে চাইতে পারে।
বিএনপির ভেতরে আলোচনায় রয়েছে—দলীয় অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার সমন্বয়ে স্পিকার পদে একজন গ্রহণযোগ্য মুখ তুলে ধরতে চায় নেতৃত্ব।
ডেপুটি স্পিকার ও চিপ হুইপ নিয়েও জল্পনা
ডেপুটি স্পিকার পদে আলোচনায় রয়েছেন লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ-সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান, ভোলা-1 আসনের ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ এবং নোয়াখালী-১ আসনের ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো অনিশ্চিত।
অন্যদিকে সরকারদলীয় চিপ হুইপ পদে শোনা যাচ্ছে নোয়াখালী-২ আসনের জয়নুল আবদিন ফারুক ও নোয়াখালী-৩ আসনের বরকত উল্লাহ বুলুর নাম। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—আলোচনায় থাকা এসব নেতার কেউই বর্তমান মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি।
সাংবিধানিক পদে রাজনৈতিক বার্তা
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার পদটি কেবল একটি প্রোটোকল পদ নয়; এটি রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব। সংসদ অধিবেশন পরিচালনা, কার্যপ্রণালি বিধি প্রয়োগ, শৃঙ্খলা রক্ষা ও সদস্যদের অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে স্পিকার কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও সাংবিধানিক প্রজ্ঞার সমন্বয় এখানে অপরিহার্য।
সবশেষ অষ্টম জাতীয় সংসদে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন বিএনপিরই স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দীন সরকার। ফলে দলীয় ইতিহাসের ধারাবাহিকতাও এবারের আলোচনায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
১২ মার্চের অধিবেশন তাই শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ সংসদের রাজনৈতিক বার্তা ঘোষণার দিন। ড. মঈন খান কি সত্যিই স্পিকারের আসনে বসছেন, নাকি শেষ মুহূর্তে চমক? সিদ্ধান্ত এখন দলীয় প্রধান ও সংসদীয় দলের ওপরই নির্ভর করছে। রাজনৈতিক অঙ্গন তাকিয়ে আছে সেই ঘোষণার দিকে।