নিজস্ব প্রতিবেদক : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সময়মতো জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণা ও বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রশাসনিক সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নে দলের অবস্থান নতুন করে তুলে ধরেছেন। নির্বাচনী রাজনীতির উত্তপ্ত মুহূর্তে এই ঘোষণা সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি বৃহত্তর মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভাষণে তারেক রহমান বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোর তীব্র সমালোচনা করে বলেন, পতিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী শক্তি দেশের সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে দলীয়করণের মাধ্যমে প্রশাসনকে দুর্বল করেছে। এর বিপরীতে বিএনপির নীতি হবে—প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান চলবে নিজস্ব সাংবিধানিক নিয়মে; প্রশাসনে নিয়োগ ও পদোন্নতি হবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে, দলীয় আনুগত্যের নয়। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, জনপ্রশাসনের কাঠামোগত সংস্কারকে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্বশর্ত হিসেবে দেখছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সময়মতো পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন ছাড়া উন্নয়ন পরিকল্পনার সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
ভাষণে সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিষয়েও একাধিক বড় প্রতিশ্রুতি উঠে আসে। দেশের প্রতিটি পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ইস্যুর মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে মাসিক আড়াই হাজার টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। পাশাপাশি শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের জন্য ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ এক বছর কিংবা কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত বিশেষ আর্থিক ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্তের কথাও বলেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
বেকার সমস্যা নিরসনে ব্যাংক, বীমা ও পুঁজিবাজারসহ অর্থনৈতিক খাতের সার্বিক সংস্কার, অঞ্চলভিত্তিক অর্থনীতি চাঙ্গা করা এবং শিল্প ও বাণিজ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশে-বিদেশে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কথা জানান তারেক রহমান। নাগরিকের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এক লাখ ‘হেলথ কেয়ার’ কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি, যার ৮০ শতাংশ নারী হবেন বলে জানান।
ভাষণের শেষভাগে তিনি অভিযোগ করেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে বছরে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার অর্থপাচার হয়েছে। এই পাচার বন্ধ করা গেলে কৃষক কার্ডসহ সামাজিক ও উৎপাদনমুখী খাতে অর্থায়ন অসম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের এই ভাষণ বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রশাসনিক সংস্কার, সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি সামগ্রিক রূপরেখা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এখন দেখার বিষয়, ভোটাররা এই প্রতিশ্রুতিগুলোকে কতটা বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তবসম্মত বলে মনে করেন—আর সেই রায়ের প্রতিফলন ঘটবে ব্যালট বাক্সে।