এস এম শাহ্ জালাল সাইফুল : নির্বাচনের মাঠে ইসলামী রাজনীতির ভেতরের দ্বন্দ্ব এবার প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। নরসিংদীর জনসভা থেকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের কঠোর বক্তব্য শুধু জামায়াতে ইসলামীর প্রতি আক্রমণ নয়, বরং ইসলামি রাজনীতির নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে এক গভীর রাজনৈতিক বিতর্কের সূচনা করেছে।
চরমোনাই পীর স্পষ্ট ভাষায় অভিযোগ তুলেছেন—জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে এক কথা বললেও আড়ালে ভিন্ন পথে হাঁটছে। তাঁর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে গোপন বৈঠকের প্রসঙ্গ এনে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন রাজনৈতিক সততার ওপর। সম্পাদকীয় দৃষ্টিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনীতিতে ‘গোপন সমঝোতা’ বনাম ‘জনসম্মুখে জবাবদিহি’—এই দ্বন্দ্ব জনগণের আস্থাকে নড়বড়ে করে তুলেছে।
তিনি যে ভাষায় বলেছেন, “গোপনের মধ্যে ডাল মে কুচ কালো হে”—তা মূলত সাধারণ মানুষের সন্দেহ ও অনাস্থারই প্রতিধ্বনি। রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু সেই যোগাযোগ যদি জনগণের সামনে স্পষ্ট না হয়, তবে প্রশ্ন উঠবেই—কার স্বার্থে, কোন এজেন্ডায় এসব বৈঠক?
চরমোনাই পীরের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন। তিনি দাবি করেছেন, গত ৫৪ বছর ধরে প্রচলিত আইনি ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে দেশ চললেও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের ‘ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিকে তিনি “ধোঁকা” বলে আখ্যায়িত করেন। এটি আসলে ইসলামি রাজনীতির ভেতরে আদর্শ বনাম বাস্তবতার সংঘাতকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি নতুন রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ার যে প্রত্যাশার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন, তা শুধু ইসলামী আন্দোলনের নয়—বরং একটি বড় অংশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব ও নীতিগত ঐক্য না থাকলে পরিবর্তনের স্বপ্ন যে কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকে, সেটিই তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন।
জোট রাজনীতি থেকে সরে এসে এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জন্য একদিকে আদর্শিক দৃঢ়তার বার্তা, অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় চ্যালেঞ্জ। তবে হাতপাখা প্রতীকে ভোট দিয়ে পরিবর্তনের আহ্বানের মধ্য দিয়ে দলটি স্পষ্ট করে দিয়েছে—তারা আপস নয়, নিজেদের নীতির ওপর আস্থা রেখেই জনগণের রায় চাইছে।
সবশেষে বলা যায়, চরমোনাই পীরের এই বক্তব্য ইসলামী রাজনীতিতে নতুন এক মেরুকরণ তৈরি করেছে। এখন প্রশ্ন হলো—ইসলামের নামে প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই পথ খোঁজা হবে, নাকি সত্যিকার অর্থে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দিকে জনগণ এগোবে? আসন্ন নির্বাচনই এই প্রশ্নের বাস্তব জবাব দেবে।