নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও শক্তিশালী জাতি গঠনের প্রশ্নে নারীর ক্ষমতায়ন কোনো বিচ্ছিন্ন বা গৌণ বিষয় নয়—এটি সরাসরি রাষ্ট্রের অর্থনীতি, গণতন্ত্র ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত। এই বাস্তবতাই স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছেন, “জাতি গঠনে নারীর ক্ষমতায়ন শুরু হতে হবে ঘর থেকে।”
রোববার (১৮ জানুয়ারি) রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে ঢাকা ফোরামের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘জাতি গঠনে নারী: নীতি, সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্যে তিনি নারীর ভূমিকা, বিদ্যমান বৈষম্য ও মানসিকতার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সুস্পষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
নিজের বক্তব্যের শুরুতেই ব্যারিস্টার জাইমা রহমান বলেন, সমাজ ও দেশের জন্য নিজের অবস্থান থেকে কিছু করার আন্তরিকতা সবার মধ্যেই থাকা উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য হলো ভিন্ন মত ও পথের মানুষেরা একসঙ্গে দেশের কল্যাণে কাজ করা—আর সেই চর্চার মাধ্যমেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।
নারীর ক্ষমতায়নের বীজ যে পরিবারেই রোপিত হয়, সে কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি তাঁর বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁর মায়ের পেশাগত সাফল্যের পেছনে পারিবারিক সমর্থনের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে জাইমা রহমান বলেন, পরিবার যদি সহায়ক না হয়, তবে নারীর সম্ভাবনা পূর্ণতা পায় না।
বক্তব্যে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী রাষ্ট্রনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর কথাও স্মরণ করেন। তাঁর মতে, নারী ও কন্যাশিশুর উন্নয়নে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা এবং পোশাক শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে লাখো নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথ উন্মুক্ত করেছিলেন জিয়াউর রহমান। একইভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচি ও মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত উদাহরণ হয়ে আছে।
বর্তমান বাস্তবতা তুলে ধরে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান বলেন, শুধু আইন বা নীতিমালা দিয়ে নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়—মানসিকতার পরিবর্তনই এখানে মূল চাবিকাঠি। তিনি জানান, বাংলাদেশে নারীরা মোট গৃহস্থালি কাজের প্রায় ৮৫ শতাংশ বিনা পারিশ্রমিকে করে থাকেন, যার আর্থিক মূল্য জিডিপির প্রায় ১৯ শতাংশ। অথচ শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনো ৪০ শতাংশের নিচে রয়ে গেছে।
তিনি আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, বিয়ে বা সন্তানের জন্মের পর নারীদের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে বাধ্য করা হয়, কারণ সমাজ ধরে নেয়—এই ত্যাগ কেবল নারীরই দায়িত্ব। পাশাপাশি অনলাইন হয়রানির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, দেশে প্রায় ৭৮ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে ডিজিটাল হেনস্তার শিকার।
বিশেষভাবে বাবাদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়ে জাইমা রহমান বলেন, মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে হবে এবং ঘরের ভেতরের বৈষম্য দূর করতে হবে। তাহলেই সমাজে প্রকৃত পরিবর্তন আসবে।
বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, “বাংলাদেশকে যদি সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নিতে হয়, তবে অর্ধেক জনসংখ্যাকে ঘরে আটকে রেখে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখা যাবে না। ক্ষমতায়ন শুরু হতে হবে আমাদের পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও সামগ্রিক মানসিকতা থেকে। তবেই একটি ন্যায়ভিত্তিক, টেকসই ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।”
এই বক্তব্য কেবল একটি আলোচনা সভার ভাষণ নয়; বরং এটি সমাজের প্রচলিত চিন্তাধারার প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা—জাতি গঠনের মূল ভিত্তি নারীর সম্মান, অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন, আর তার শুরু ঘর থেকেই।