এস এম শাহ্ জালাল সাইফুল : বাংলাদেশের রাজনীতিতে মানবিকতা ও নেতৃত্ব—এই দুইয়ের যে বিরল সমন্বয়, তার প্রতীক হয়ে উঠেছেন জনাব তারেক রহমান। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, আচরণ এবং কর্মসূচি বারবার প্রমাণ করেছে—রাজনীতি কেবল ক্ষমতার হিসাব নয়, রাজনীতি মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি দায়বদ্ধ লড়াই। সংকটের মুহূর্তে তিনি যেমন সাহসী, তেমনি বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতেও তিনি অনন্য।
ফ্যাসিস্ট শাসনের দুঃশাসনে যখন বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন, তখন তাদের পরিবারগুলোকে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে একা ফেলে দেননি তারেক রহমান। শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু সহানুভূতির ভাষা নয়, বাস্তব সহায়তার নজির স্থাপন করেছেন—জমি কিনে ঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন, জীবনধারণের পথ তৈরি করে দিয়েছেন। রাজনীতিতে এমন মানবিক উদ্যোগ আজ বিরল।
তারেক রহমান বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষক, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এবং আপোষহীন দেশনেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান। ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্ম নেওয়া এই নেতা শৈশব থেকেই ইতিহাসের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবারের সঙ্গে তিনিও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন—স্বাধীনতার জন্য কারাবরণকারী সর্বকনিষ্ঠদের একজন ছিলেন তিনি।
ছাত্রজীবন থেকেই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় তারেক রহমান ১৯৮০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়নকালে স্বৈরশাসক এরশাদের পাতানো নির্বাচনের বিরুদ্ধে সাহসী কণ্ঠে কথা বলেন। এর মূল্য দিতে হয়েছে বারবার গৃহবন্দিত্ব ও দমন-পীড়নের শিকার হয়ে। তবুও নত হননি।
তৃণমূল থেকেই রাজনীতির পাঠ নিয়েছেন তিনি। ১৯৮৮ সালে বিএনপির গাবতলী উপজেলা ইউনিটের সাধারণ সদস্য হিসেবে দলে যোগ দিয়ে সংগঠক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দেশের প্রতিটি জেলায় ছুটে বেড়িয়ে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ইতিহাসে স্বীকৃত।
বগুড়ায় গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া চালু করে তিনি দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা শুরু করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার ও সুশাসন নিয়ে গবেষণাভিত্তিক রাজনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তিনি বিএনপিকে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পথে নিয়ে যান। ক্ষমতার শীর্ষে থাকার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো মন্ত্রিত্ব বা সংসদ সদস্যপদ গ্রহণ না করে তিনি তৃণমূল শক্তিশালী করাকেই প্রাধান্য দেন—যা রাজনীতিতে বিরল দৃষ্টান্ত।
২০০৭ সালে অগণতান্ত্রিক সামরিক-সমর্থিত শাসনের সময় তাকে গ্রেপ্তার করে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। প্রায় আঠারো মাস কারাভোগের পর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তিনি মুক্তি পান এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। এরপর দীর্ঘ ১৮ বছর প্রবাসে থেকেও তিনি দলের নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হননি।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় ৮৪টি মিথ্যা মামলা। একতরফা রায়ে সাজা দেওয়া হলেও ২০২৪ সালে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আদালত সব অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়। ন্যায়বিচার অবশেষে প্রতিষ্ঠিত হয়।
২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে তারেক রহমান দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। প্রায় দুই দশকের নির্বাসনের অবসান ঘটে। লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে গণসংবর্ধনা প্রমাণ করে—জনগণের হৃদয়ে তারেক রহমান কতটা গভীরভাবে প্রোথিত।
তিনি আজ একটি কল্যাণমূলক, জনবান্ধব রাষ্ট্রের রূপরেখা তুলে ধরছেন। ৩১ দফা ঘোষণার মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য, গণতন্ত্র ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা—ফ্যামিলি কার্ড, ফারমার্স কার্ড, হেলথ কার্ড—এসব উদ্যোগ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার রূপরেখা।
ব্রিটিশ সাপ্তাহিকী দ্য উইক ২০২৫ সালের এপ্রিল সংখ্যায় তারেক রহমানকে নিয়ে প্রকাশিত কাভার স্টোরিতে তাকে আখ্যায়িত করেছে ‘ডেসটিনি’স চাইল্ড’ হিসেবে। প্রতিবেদনে বলা হয়—বিএনপিকে ভাঙার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তারেক রহমানই দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন এবং তিনি পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন।
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিএনপির নেতৃত্বে শূন্যতা সৃষ্টি হয়। সেই শূন্যতা পূরণ করে ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তারেক রহমান।
জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান—তিনজনই ইতিহাসের কঠিনতম সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আজ আবারও এক সংকটময় অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। এই সময়ে তারেক রহমানের নেতৃত্ব শুধু একটি দলের নয়, এটি গণতন্ত্র, মানবিকতা ও জনগণের অধিকার পুনরুদ্ধারের প্রতীক হয়ে উঠছে।
রাজনীতি যদি মানুষের জন্য হয়—তবে তারেক রহমান সেই রাজনীতিরই নাম।