বঙ্গ নিউজ বিডি প্রতিবেদক : নির্বাচনি রাজনীতির মাঠে যখন জনগণ কর্মসূচি, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখার কথা শুনতে চায়, তখন ঝালকাঠি-১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ড. ফয়জুল হক হাজির হলেন বিড়ির সুখটান, গসিপ আর ‘মাফ পাওয়ার’ ধর্মীয় বয়ান নিয়ে। রাজনীতিকে যুক্তির জায়গা থেকে সরিয়ে এনে ধোঁয়া আর দাওয়াতের মিশেলে ফেলা এই বক্তব্য ইতোমধ্যেই জনমনে প্রশ্ন, ক্ষোভ ও হাস্যরস—সবকিছুর জন্ম দিয়েছে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাতে রাজাপুরে এক উঠান বৈঠকে ফয়জুল হক যে বক্তব্য দেন, তা বৃহস্পতিবার রাতে তার ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে ভাইরাল হলে রাজনৈতিক মহলে নড়চড় শুরু হয়। তিনি বলেন, কেউ যদি বিড়িতে সুখটান দিয়েও ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের দাওয়াত দেয়, তবে আল্লাহ তাকে মাফ করে ভালো মানুষ বানিয়ে দিতে পারেন। অর্থাৎ ভোটের আহ্বানকেই তিনি পাপ মোচনের সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করলেন—যা ধর্মীয় অনুভূতির সরাসরি রাজনৈতিক ব্যবহার ছাড়া আর কিছু নয়।
এ বক্তব্যে মূল আলোচ্য হয়ে ওঠে এক ভয়ংকর প্রবণতা—ধর্মকে রাজনৈতিক ঢাল বানিয়ে যেকোনো আচরণকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা। বিড়ি, যা নিজেই ক্ষতিকর অভ্যাস হিসেবে পরিচিত, সেটিকেও ভোটের দাওয়াতের ‘পুণ্যমাধ্যম’ বানিয়ে ফেলা হয়। প্রশ্ন উঠছে, তাহলে রাজনীতি কি এখন নীতি, আদর্শ আর কর্মসূচির জায়গা হারিয়ে আত্মিক দরকষাকষির মঞ্চে পরিণত হলো?
বক্তব্য এখানেই থামেনি। পুরুষ ভোটারদের উদ্দেশ্যে তিনি উপদেশ দেন—৫ টাকার চা খেয়ে ১৫ টাকার গল্প করতে এবং সর্বত্র ‘দাঁড়িপাল্লার জয়জয়কার’ ছড়াতে। নারীদের জন্য নির্দেশনা আরও স্পষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত—গল্পের আড্ডা, চুলের বেণী বাঁধা, এমনকি পারিবারিক ফোনালাপেও যেন ভোটের প্রচার ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। মা-বোনদের অন্তত ২০ জন আত্মীয়কে ফোন করে ভোট চাইতে বলা হয়—যেন নারী সমাজ কেবল সংগঠিত ভোটযন্ত্র, নাগরিক নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল অভিনব প্রচারণা নয়; এটি একধরনের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় চাপ সৃষ্টি করার কৌশল। যেখানে ভোটাধিকারকে যুক্তি বা বিবেচনার বিষয় না বানিয়ে আবেগ, ভয় ও ধর্মীয় আশ্বাসের সঙ্গে বেঁধে ফেলার চেষ্টা স্পষ্ট।
কায়েদ সাহেব হুজুরের নাতি হিসেবে পরিচিত ফয়জুল হক তার পারিবারিক ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করছেন—এ অভিযোগ নতুন নয়। তবে এবারের বক্তব্য সেই সীমা ছাড়িয়ে গেছে বলেই মনে করছেন অনেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ এটিকে ‘হাস্যকর নাটক’ বলছেন, কেউ আবার ‘ভয়ংকর রাজনৈতিক বার্তা’ হিসেবে দেখছেন।
একদিকে যখন দেশ গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে, তখন এমন বক্তব্য রাজনীতির মান নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করছে। ঝালকাঠি-১–এর এই ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে—বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে এখনো ধর্ম, আবেগ ও ব্যক্তিগত প্রভাব কতটা নির্দ্বিধায় ব্যবহার করা হচ্ছে, আর নীতি ও দায়বদ্ধতা কতটা আড়ালে চলে যাচ্ছে।