নিজস্ব প্রতিবেদক : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙ্গামাটি–২৯৯ আসনের প্রার্থিতার তালিকা শুধু সংখ্যার বিচারে নয়, রাজনৈতিক বাস্তবতার দিক থেকেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। সাতজন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র একজন নারী—বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টির নেত্রী জুঁই চাকমা। পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির চিরাচরিত কাঠামোর ভেতরে তাঁর এই উপস্থিতি নিঃসন্দেহে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু প্রতীকী উপস্থিতির বাইরে তাঁর হলফনামায় ঘোষিত আয়-ব্যয়ের হিসাব ও সম্পদের বিবরণ রাজনীতির আরও গভীর ও অস্বস্তিকর বাস্তবতা উন্মোচন করেছে।
জুঁই চাকমা নিজেকে একজন কৃষিজীবী রাজনীতিক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ঘোষিত বার্ষিক আয় মাত্র দেড় লাখ টাকা। কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, ফসল বিক্রি ও বাড়িভাড়া—সব মিলিয়ে এই আয় একজন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, এই সীমিত আয়ের বিপরীতে কীভাবে তাঁর ও তাঁর পরিবারের নামে কোটি টাকার স্থাবর সম্পদের অস্তিত্ব গড়ে উঠেছে?
হলফনামা অনুযায়ী, জুঁই চাকমার নিজের নামে থাকা ৩০ শতক অকৃষি জমি ও ঘরবাড়ির মূল্য কয়েক দশ লাখ টাকার ঘরে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তাঁর স্বামীর নামে থাকা তিন একর জমি ও একাধিক আধাপাকা ঘর—যার ঘোষিত মূল্যই ছাড়িয়ে গেছে তিন কোটি টাকা। আইনের দৃষ্টিতে এসব সম্পদ বৈধ হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক নৈতিকতার বিচারে এই আয়-সম্পদের অসামঞ্জস্য ভোটারদের সামনে একটি স্পষ্ট প্রশ্নচিহ্ন রেখে যায়।
রাজনীতিতে স্বচ্ছতা কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়; এটি জনআস্থার ভিত্তি। যখন একজন প্রার্থী নিজেকে প্রান্তিক কৃষিজীবী হিসেবে তুলে ধরেন, অথচ পারিবারিক সম্পদের পরিমাণ কোটি টাকায় পৌঁছে যায়, তখন সেই রাজনৈতিক বয়ান বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে। এ ধরনের অসামঞ্জস্য নতুন নয়, তবে পাহাড়ি অঞ্চলের সংবেদনশীল রাজনীতিতে এর প্রভাব আরও গভীর।
জুঁই চাকমার বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে দায়ের হওয়া সাইবার ট্রাইব্যুনালের মামলা পরবর্তীতে খারিজ হলেও রাজনৈতিক ইতিহাসে এর উল্লেখ থেকে যায়। মামলার নিষ্পত্তি তাঁকে আইনি দায় থেকে মুক্ত করলেও, রাজনীতিতে বিশ্বাস ও ভাবমূর্তির প্রশ্ন আইনি গণ্ডির বাইরেও বিস্তৃত।
এই প্রেক্ষাপটে রাঙ্গামাটি–২৯৯ আসনের নির্বাচন কেবল ব্যক্তি বনাম ব্যক্তির লড়াই নয়; এটি নারী প্রতিনিধিত্ব, রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও সম্পদের জবাবদিহির একটি পরীক্ষাক্ষেত্র। পাহাড়ি অঞ্চলের ভোটাররা দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের কথা শুনে আসছেন। এবার তাঁদের সামনে থাকা প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট—প্রার্থীর রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে তাঁর ঘোষিত বাস্তবতা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
শেষ পর্যন্ত ভোটাররাই নির্ধারণ করবেন, সীমিত আয়ের বিপরীতে বিপুল সম্পদের এই হিসাব তাঁদের কাছে গ্রহণযোগ্য কি না। রাঙ্গামাটি–২৯৯ আসনের এই নির্বাচন তাই একটি আসনের ফলাফলের চেয়েও বেশি কিছু—এটি দেশের রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার মানদণ্ড কতটা কার্যকর, তার একটি প্রতিফলন হয়ে উঠতে পারে।