নিজস্ব প্রতিবেদক : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে, তা কেবল একটি প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়—বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাষ্ট্রীয় সংকট ও জনআকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষাপটে একটি বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তার রূপরেখা বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
বুধবার (৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনের গ্র্যান্ড বলরুমে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করেন। ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে ঘোষিত ইশতেহারে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে ২৬টি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করার কথা জানিয়েছে দলটি। পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা হিসেবে ৪১টি ভিশনের কথাও তুলে ধরা হয়।
ইশতেহারের মূল সুরে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনায় যুবকদের প্রাধান্য, নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিতকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সমাজ বিনির্মাণ।
রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—জামায়াত তাদের ইশতেহারে জুলাই বিপ্লব ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জুলাই বিপ্লবের শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী যোদ্ধাদের পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দলটি স্পষ্ট করেছে যে তারা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক গণঅভ্যুত্থানকে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে দেখতে চায়।
অর্থনীতি ও উন্নয়নের প্রশ্নে ইশতেহারে ব্যাংকসহ আর্থিক খাত সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, কর্মসংস্থানমুখী শিল্পায়ন এবং কৃষিতে প্রযুক্তিনির্ভর বিপ্লবের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা, ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং ‘তিন শূন্য ভিশন’-এর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনাও স্থান পেয়েছে।
গণতন্ত্র ও নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কারে সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচন, শক্তিশালী তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিতের প্রস্তাব ইশতেহারকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। পাশাপাশি অতীতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত খুন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচারের অঙ্গীকার দলটির মানবাধিকারকেন্দ্রিক অবস্থানকে জোরালোভাবে তুলে ধরে।
সামাজিক খাতে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা, স্বল্পমূল্যে আবাসন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে জামায়াত নিজেদেরকে একটি ‘কল্যাণরাষ্ট্রের’ রূপকার হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছে।
সব মিলিয়ে, জামায়াতে ইসলামীর ঘোষিত ইশতেহার আগামী নির্বাচনের রাজনৈতিক বিতর্কে একটি সুস্পষ্ট আদর্শিক ও কাঠামোগত প্রস্তাবনা হিসেবে যুক্ত হলো। তবে এসব অঙ্গীকার কতটা বাস্তবসম্মত, বাস্তবায়নের রোডম্যাপ কতটা কার্যকর এবং জনগণ কতটা আস্থা রাখে—তার চূড়ান্ত মূল্যায়ন হবে নির্বাচনী মাঠ ও ব্যালট বাক্সে।