নিজস্ব প্রতিবেদক : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পাঁচ অধ্যায়ে বিভক্ত নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। শুক্রবার বিকেলে রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন।
ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ও অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়েছে।
রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারে অগ্রাধিকার
ইশতেহারের প্রথম অধ্যায়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন, সাংবিধানিক সংস্কার, জাতীয় ঐক্য, সুশাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, পুলিশ সংস্কার এবং শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
বৈষম্যহীন উন্নয়নের প্রত্যয়
দ্বিতীয় অধ্যায়ে বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের কথা তুলে ধরা হয়। দারিদ্র্য নিরসন, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার, নারী ক্ষমতায়ন, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, শ্রমিক ও প্রবাসী কল্যাণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনের পরিকল্পনা
তৃতীয় অধ্যায়ে ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের রূপরেখা দেওয়া হয়। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কার, শিল্প ও সেবা খাত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, পরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়ন, সৃজনশীল অর্থনীতি এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে।
অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন
চতুর্থ অধ্যায়ে অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা, হাওর-বাঁওড় ও উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন, পরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন ব্যবস্থা, নিরাপদ ও টেকসই ঢাকা নির্মাণ এবং পর্যটন খাত উন্নয়নের অঙ্গীকার রয়েছে।
ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতিতে নৈতিক পুনর্জাগরণ
পঞ্চম ও শেষ অধ্যায়ে ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা, পাহাড় ও সমতলের জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিতকরণ, ক্রীড়া উন্নয়ন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা এবং নৈতিকতার শক্ত পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
বিএনপির ৯টি প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি
ইশতেহারে বিএনপি নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
প্রান্তিক পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর মাধ্যমে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা বা সমমূল্যের পণ্য সরবরাহ, ‘কৃষক কার্ড’ চালু করে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, মিড-ডে মিলসহ কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা, তরুণদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সহায়তা, ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গড়ে তোলা, পরিবেশ রক্ষায় নদী খনন ও বৃক্ষরোপণ, ধর্মীয় সম্প্রীতি জোরদার এবং ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (পেপাল) চালু।
নতুন রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা
বিএনপি নেতারা বলেন, এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়; এটি জনগণের সঙ্গে একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। বিএনপি প্রতিশোধের রাজনীতিতে নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই তাদের রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু।
লুটপাট নয় উৎপাদন, ভয় নয় অধিকার, বৈষম্য নয় ন্যায্যতার ভিত্তিতেই রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।